চট্টগ্রাম নগরের একটি ফ্ল্যাটে গোপনে বসে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে আটক ৬৩ বিদেশি নাগরিকের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে লাওসের ৩৫, পাকিস্তানের ২১, চীনের পাঁচ এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।
বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে অবস্থান করে কীভাবে প্রতারণার কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন, তাদের বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এই চক্রের নেপথ্যে কারা—এসব খতিয়ে দেখছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ (সিটিটিসি)।
খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটির একটি আটতলা ভবনের পঞ্চম তলার ‘ই-২’ ফ্ল্যাট থেকে তাদের আটক করা হয়। এ সময় ফ্ল্যাটটি থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, প্রিন্টার, পেনড্রাইভ ও বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় শুক্রবার খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সিটিটিসিকে। এরই মধ্যে জব্দ আলামত ও আটক বিদেশি নাগরিকদের সিটিটিসির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
পুলিশের করা এজাহার অনুযায়ী, আটক ৬৩ বিদেশির মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাওসের নাগরিক ৩৫ জন। এ ছাড়া পাকিস্তানের ২১, চীনের পাঁচ এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে রয়েছেন। তাদের সবার বর্তমান ঠিকানা হিসেবে একই ফ্ল্যাটের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে লাওসের নাগরিক হিসেবে তিয়েং, মানি ভ্যান, কেও, তোক, সিমোনেখাম, দাও, মেকো, আলী, সাকোন, খোন চাই, বুন মি, তোয়ো, সুকসাখোন, সুলিসা, মানিভান চান্থাফোন, ফুয়াং, মাই, বুনথাভি, কেওমানি, সিয়ামপাই, নি, নকসান্নিভাথ বুয়ালিয়েনফাই, সুফাবোন ভং নাই, থিলাকোন ফুন সা ভাথ, ইয়িলেং থর, সোমচিত জাইয়াভং, ফাইমানি সিসোমবুথ, ফেতসামগুয়ান কেওতা, সিলিফং ইনথাভং, থংজিউয়া চান্থাভং, সাইকাথ বুয়াভান, সিভিলাই, মিক্সাই ভংহালাথ, ভিলাইফোন লুয়াংলাথ ও সোমফুভান ফোমফিথাকের নাম রয়েছে।
পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন আহসান সাবির, মোহাম্মদ রিজওয়ান, মোহাম্মদ তালহা, মোহাম্মদ উসমান, মোহাম্মদ রমজান, মোহাম্মদ খান, নাভিদ খান, ফারহান উল্লাহ, রেহান আলী, ফাহাদ জামিল, খিজার ফারুক, জয়নাল-উল-আবেদীন, আলী আহমেদ, আমির জামান, আমজাদ, গহর, হাম্মাদ, হুজাইফ খান, শাহজাদ খান, সোনিয়া ও মরিয়ম।
চীনের পাঁচ নাগরিক হলেন লিউ গুনাং শু, ঝাং কিন, ইয়াং ইয়ং বিও, লিউ বিং ও ইয়াং ঝং হাই। নেপালের সরোজ এবং ভিয়েতনামের থুওং থি ডাংও রয়েছেন আটক তালিকায়।
মোবাইল ১৩৪, ল্যাপটপ ৫৭
অভিযানে জব্দ করা আলামতের তালিকায় বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ রয়েছে। ১৩৪টি ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মধ্যে অ্যাপলের ৪৯টি, অপোর ৫২টি, স্যামসাংয়ের ১০টি, ইনফিনিক্সের আটটি, ভিভোর পাঁচটি, রেডমির চারটি, পোভার দুটি এবং হুয়াওয়ে ও টেকনোর একটি করে ফোন রয়েছে। অচেনা ব্র্যান্ডের আরও দুটি ফোন জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অ্যাপলের একটি ট্যাব, কালো রঙের থিংকপ্যাড ব্র্যান্ডের ৫৫টি ল্যাপটপ ও সিলভার রঙের লেনোভোর দুটি ল্যাপটপসহ মোট ৫৭টি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
ফ্ল্যাটটি থেকে একটি গিগাবাইট ব্র্যান্ডের সিপিইউ (যার ভেতরে ৫১২ জিবির একটি এসএসডি ছিল), একটি স্যামসাং মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, এপসন প্রিন্টার, পাঁচটি পেনড্রাইভ এবং চারটি মোবাইল সিমকার্ডও জব্দ করা হয়। সিমকার্ডগুলোর মধ্যে তিনটি রবি ও একটি এয়ারটেলের।
পুলিশের জব্দ তালিকায় নাভিদ খান, গহর আইয়ুব ও ফারহান উল্লাহ নামের তিন পাকিস্তানি নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং আলী আজান নামের একজনের কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ডও রয়েছে।
কীভাবে এলেন, খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি
পুলিশের করা মামলায় ৬৩ বিদেশির বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং অননুমোদিত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব বিদেশি নাগরিক কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের ভিসা বা অবস্থানের বৈধতা কী, কে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তারা কথিত প্রতারণা চক্রে যুক্ত হয়েছেন—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
প্রথমে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে ইন্সপেক্টর রাসেল মাহমুদকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরে মামলাটির তদন্তভার সিটিটিসিকে দেওয়া হয়।