বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ঘরে ঘরে। একটু অস্বস্তি বা পেট ব্যথা হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় প্রায় সবার মধ্যে। তবে এই সাময়িক স্বস্তি যে ডেকে আনছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
বিশাল বাজার ও আমাদের ভুল ধারণা
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে মাত্র তিনটি নির্দিষ্ট গ্যাস্ট্রিকের ওষুধেরই বার্ষিক বিক্রি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। আর এই ওষুধের পুরো বাজারটি ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ওষুধ সেবন করা সত্ত্বেও কিন্তু মানুষের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এর পেছনে প্রধান কারণ আমাদের নিজেদের ভুল অভ্যাস।
গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা হলে অনেকেই বুক জ্বালাপোড়া কিংবা পেটে ব্যথা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ওমিপ্রাজল বা এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ খেয়ে নেন। এতে সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও ওষুধ ছাড়ার কিছুদিন পরই সমস্যাটি আবার ফিরে আসে। এভাবে মানুষ একটি চক্রের মধ্যে পড়ে যায় এবং বারবার ওষুধ সেবন করতে থাকে।
উপসর্গ বনাম মূল সমস্যা
আমাদের বুঝতে হবে যে বুক জ্বালাপোড়া বা পেট ব্যথা হলো মূল সমস্যার উপসর্গ (Symptom), মূল রোগ নয়। প্রকৃত বিষয়টি হচ্ছে—পাকস্থলীর ভেতরের কৃত্রিম ঢাকনা বা ‘লোয়ার ইসোফেগাল স্ফিঙ্কটার’ (Lower Esophageal Sphincter) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা পেটে কোনো ক্ষত (Ulcer) তৈরি হওয়াই এই কষ্টের মূল কারণ।
এক্ষেত্রে নিজে নিজে ওমিপ্রাজল বা এন্টাসিড খেলে তা কেবল পাকস্থলীর এসিডকে নিউট্রালাইজ করে বা এসিড উৎপাদন সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। কিন্তু ভেতরের ক্ষত বা দরজার যে ড্যামেজ, তা ওষুধ দিয়ে নিরাময় হয় না; সেটি থেকেই যায়। ফলে আবারও সমস্যা দেখা দিলে পুনরায় ওষুধ সেবন করতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫১% মানুষ এই চক্র থেকে বের হতে পারেন না এবং বছরের পর বছর নিয়মিত এসব ওষুধ খেয়ে যান। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ওষুধ খাওয়ার ফলেই বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের এই বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে ওমিপ্রাজল বা পিপিআই (PPI) জাতীয় ওষুধ খেয়ে গেলে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন—হাড়ের ক্ষয় ভিটামিন ঘাটতি এবং কিডনি সমস্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এসিড কমানোর ওষুধ সেবনে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। একই সাথে শরীরে ভিটামিন বি১২ (Vitamin B12)-এর শোষণে বাধা সৃষ্টি হয় এবং ঘাটতি দেখা দেয়। এ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে অহেতুক পিপিআই সেবন কিডনির কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থায়ী সমাধান কী?
সাময়িক উপশমের পেছনে না ছুটে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করাই গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে না খেয়ে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মূল সমস্যাটি চিহ্নিত করে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে বারবার গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না এবং এই যন্ত্রণা থেকেও চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
সূত্র: ড. সাব্বির আহমেদ, পোস্ট-ডক্টরাল বিজ্ঞানী, ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার উটরেখ্ট অ্যান্ড উটরেখ্ট ইউনিভার্সিটি