নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পর বিলুপ্ত হলো দেশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনে বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।
দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন থেকেই র্যাবের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয় তৎকালীন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অধ্যাদেশ/আইন সংশোধনের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে র্যাবের ইউনিট। শুরু থেকেই বাহিনীটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা। অল্প সময়ের মধ্যেই র্যাব দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিশেষ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করে বাহিনীটি। তবে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষায়িত এই ইউনিটকে গুম-ক্রসফায়ারের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়। এমনকি র্যাব বিলুপ্তির দাবিও জানায় বিভিন্ন সংস্থা।
বিগত বছরগুলোতে র্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাহিনীটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। ফলে সময়ের সঙ্গে র্যাবকে সংস্কার, পুনর্গঠন কিংবা বিলুপ্ত করে নতুন কাঠামো তৈরির দাবি জোরাল হয়। শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনের পথেই গেল সরকার।জিওর অপেক্ষায় এসআরবি
সংসদে নতুন আইন অনুমোদন পেলেও এখনই মাঠে নামতে পারছে না এসআরবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত নতুন বাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব নয়। এ কারণে আইন অনুমোদনের পরও এসআরবির কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে সাময়িক স্থবিরতা।
বিলুপ্ত হওয়া র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, নতুন আইন ও নতুন নামে শিগগিরই দায়িত্ব পালন শুরু করবেন তারা। তার ভাষ্য, ‘গতকাল থেকে আমরা র্যাবের কোনো মনোগ্রাম এবং ইনসিগনিয়া ব্যবহার করছি না। সরকারের পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছি। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত ইউনিটের সদস্যরা দূরে থাকবেন না।’
তাহলে এখন মাঠে কারা?
র্যাব বিলুপ্ত এবং এসআরবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু না করায় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেটা হলো—বিশেষ অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন হলে দায়িত্ব পালন করবে কোন বাহিনী?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্যান্য বাহিনী তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। তবে র্যাবের মতো একটি বিশেষায়িত বাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য, গ্রেপ্তার ও তদন্তের দায়িত্বে সাময়িক সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো ঘটনায় দ্রুত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেই নজর দিতে হবে।
দায়িত্বে এপিবিএন
র্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন—এপিবিএনকে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমে তদন্তের দায়িত্বের কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে।
আগে যেসব ঘটনায় বিশেষায়িত বাহিনী অভিযান পরিচালনা করত, সেসব ঘটনায় তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে—নতুন কাঠামোয় তারও একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। অভিযান ও তদন্তের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মামলার কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
র্যাব সদস্যদের ভবিষ্যৎ কী?
র্যাব বিলুপ্তির পর বাহিনীটির সদস্যদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এসব সদস্যের। ফলে তাদের একটি বড় অংশকে এসআরবিতে যুক্ত করা হবে কি না, নাকি পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীতে পুনর্বিন্যাস করা হবে সরকারি আদেশে তা স্পষ্ট হওয়ার কথা। একই সঙ্গে নতুন বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ও ইউনিট বিন্যাস কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষিত জনবলকে কাজে লাগাতে পারলে নতুন বাহিনী দ্রুত সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। অন্যদিকে অভিজ্ঞ জনবলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা না গেলে নতুন কাঠামো কার্যকর হতে সময় লাগতে পারে।
নাম বদল, নাকি কাঠামোরও পরিবর্তন?
র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনকে শুধু নাম পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। নতুন আইন অনুযায়ী বাহিনীর কাঠামো ও দায়িত্বের মধ্যে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এর বাস্তব চিত্র নির্ভর করবে সরকারি আদেশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।
বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবির কার্যক্রম কতটা স্বাধীন হবে, কোন সংস্থার সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবে, অভিযান পরিচালনায় তার ক্ষমতা কতটুকু থাকবে এবং জবাবদিহির কাঠামো কী হবে— এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর।