Image description

সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৯২ জন। প্রতিদিনই হাসপাতালে আসছে নতুন রোগী। রাজধানীর শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ছে। সেখানে ক্রিটিক্যাল রোগীকে আইসিইউয়ের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। তবে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বেশ কিছু বেড খালি রয়েছে।  

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে এই চিত্র লক্ষ্য করা যায়।  

আইসিইউর অপেক্ষায় ক্যান্সার আক্রান্ত লামিয়া

৮ বছরের শিশু লামিয়ার শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। এখন তার কেমোথেরাপি চলছে। শ্যামলীর শিশু হাসপাতালেই চলে চিকিৎসা। চতুর্থ কেমো দেওয়ার সময় এসেছে। এরই মধ্যে প্রচণ্ড জ্বর। পরিবারের লোকজন নিয়ে আসে হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এখন তার কেমোথেরাপিও দিতে পারছে না। শারীরিক অবস্থাও খারাপ হচ্ছে। লামিয়ার প্রয়োজন আইসিইউ, কিন্তু সেটাও পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা কেবল অপেক্ষা করছেন কখন একটি আইসিইউ’র বেড ফাঁকা হবে। 

শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু রোগীর কর্নারে গিয়ে লামিয়ার খালা বিথী আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। বিথি বলেন, আমরা হাসপাতালে পাঁচ দিন ধরে ভর্তি আছি। আমরা এই জায়গায় (শিশু হাসপাতালে) চিকিৎসা করাই সবসময়। রেগুলার চেকআপে থাকা লাগে। এখন ওর জ্বর হওয়ায় নিয়ে এসেছিলাম। পরীক্ষা করিয়েছি...ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। 

তিনি বলেন, ও ক্যান্সারের রোগী। ওর আরেকটা কেমো দেওয়ার ডেট এসে পড়েছে। যেহেতু ওর ক্যান্সার, তাই ডেঙ্গুর অ্যান্টিবায়োটিক ওর শরীরে তিন দিন ধরে পুশ করেনি। স্যালাইন দিয়ে রাখছে। কিন্তু ওর অবস্থা গুরুত্বর। আইসিইউতে ভর্তি করা লাগবে। কিন্তু বেড খালি পাইনি।

১২ বছরের ফানান পড়ে ক্লাস সিক্সে। ৪-৫ দিন ধরে ভীষণ জ্বর ও শরীর ব্যথা। ডাক্তারের কাছে নেওয়ার পর গতকাল তার পরিবার জানতে পারে সে ডেঙ্গু আক্রান্ত। পরে ডাক্তারের পরামর্শে আজকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করে। 

এ সময় কথা হয় হাসপাতালে ফানানের সঙ্গে থাকা তার ফুপু ফাইজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪-৫ দিন তীব্র জ্বর আর শরীর ব্যথার পর কালকে আমরা টেস্ট করাই। পরে ডাক্তার বলেছেন, হসপিটালাইজড করতে হবে। তাই আজ সকালে নিয়ে আসি, কিন্তু সিট পাইনি। পরে একজন রোগী চলে যাওয়ার দুপুরে সিট পেয়েছি। 

অনামিকা ডাকোয়া ছেলেকে নিয়ে আট দিন ধরে আছেন হাসপাতালে। তিনি বলেন, আট দিন আগে ওর ডেঙ্গু ধরা পড়ে, আমরা সরাসরি এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন অনেকটা ভালো। ডাক্তার বলেছে, সব ঠিক থাকলে শনিবার আমাদের ছুটি দিয়ে দেবে। 

সিট পেতে ঘুরতে হয়েছে দুই দিন

ধানমন্ডির কাঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা আফরোজা আক্তার হেলেন। তার এক বছর ১০ দিন বয়সী মেয়ের ডেঙ্গু হয়েছে। তাকে নিয়েই শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। 

হেলেন বলেন, কয়েকদিন আগে রাত দুইটার দিকে দেখি বাচ্চা কাঁপুনি দেওয়া আরম্ভ করছে। দেখি অনেক জ্বর, কিন্তু কমে না। তারপরে গ্রিন লাইফে হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। টেস্টে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। তারপর হাসপাতালে ভর্তি হতে বললে এখানে নিয়ে আসি, কিন্তু সিট পাইনি। পরে বাসায় চলে যাই। পরের দিন আবারও সকালে এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরে দুপুরের দিকে সিট পেয়েছি। 

শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। তারা জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য একটি কর্নার করা হয়েছে। তবে সেখানেই সব রোগী নেই। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কেবিনে রোগী ভর্তি আছে। সব মিলিয়েই ২৭ জন রোগী রয়েছে। 

হাসপাতালটির দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন ডেঙ্গু রোগী প্রচুর আসছে। আমরা তো রোগী ছুটি দিই। তবুও আমাদের প্রতিদিন প্রচুর রোগী আসছে। 

ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের রোগীও বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ডেঙ্গু কেন, অনেক হামের রোগীও আসছে। আমাদের পোস্ট-মিজেলস উইথ ডেঙ্গু নিয়ে রোগী আসছে। যার ১৪ দিন আগে হাম হয়েছে, সেই রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাজির হয়েছে কালকে।

সোহরাওয়ার্দীতে ডেঙ্গুর বেড খালি

এদিকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বেড অনেকই ফাঁকা রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৪২০ ও ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড দুটি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে  ৪২০ নম্বর ওয়ার্ড পুরুষদের জন্য এবং ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড নারীদের জন্য। দুই ওয়ার্ডে বেডের সংখ্যা ৯১টি। এখানে দুই ওয়ার্ডের বেশকিছু বেড ফাঁকা রয়েছে। 

মহিলা ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স সৈকত আলম বলেন, আমাদের এখানে ৪১টি বেড আছে। এর মধ্যে এখন ২৭ জন ভর্তি আছে। তবে সকালে সব বেড ফিলআপ ছিল। ১২টার পরে অনেকে ছুটি নিয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের কিছু বেড ফাঁকা আছে। 

আরেক ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, এই ওয়ার্ডে ৫০টা বেড আছে। আর ভর্তি আছেন ২৫ জন। কালকে রাতে পর্যন্ত ৪০ জন ভর্তি ছিল। অনেককে ছুটি দেওয়া হয়েছে, তারা চলে গিয়েছেন। কিন্তু আজকে সকাল থেকে একজনও নতুন রোগী আসেনি। আমাদের সব বেড ফিলআপ হয় না। 

এ সময় কোন জায়গা থেকে বেশি রোগী আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশিরভাগই আসেন ঢাকার ভেতর থেকে। মিরপুর ১৩ নম্বর ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বেশি রোগী আসে। 

নারায়ানগঞ্জ থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তিনদিন আগে স্বামীকে নিয়ে এসেছেন আয়শা আক্তার।  তিনি বলেন, আমার স্বামীর প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে এখানে এসেছি। এসেই সিট পেয়েছি। কিছুদিন আগে তার হার্টে রিঙ পড়ানো হয়েছে। এরমধ্যে এই অবস্থা। 

মাসের শেষ ও অক্টোবরে ডেঙ্গুর পিকের আশঙ্কা

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, আমাদের এখন একটা জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা চলছে—ডেঙ্গু। ডেঙ্গু আবার বেড়েছে। এ মাসের শেষ সপ্তাহে এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর পিক সময়টা আসতে যাচ্ছে। তো এটার আগে এখানেও প্রিভেনশনের কথাটা চলে আসছে। আমরা ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা সভা করেছি। আমরা ডেঙ্গুবিষয়ক একটা তিন মাসের ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছি।

ডেঙ্গুর প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে যা বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

বৃহস্পতিবার প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, চলতি মাসের শেষ দিকে বা আগামী মাসের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ পিকে থাকবে। এই মুহূর্তে করণীয় কী এবং এবার কেন ডেঙ্গু বাড়ছে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গুর দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো প্রতিরোধ, অন্যটি চিকিৎসা। প্রতিরোধের বিষয়টিও দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নির্মূল করা, অন্যটি ডেঙ্গু প্রতিরোধী টীকা। 

তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ডেঙ্গু মহামারির পর বাংলাদেশে ডেঙ্গু বড় শহরের রোগ বা আরবান ডিজিজ থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম ও বিভিন্ন অঞ্চলেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে ডেঙ্গু শুধু বর্ষা বা বৃষ্টি মৌসুমের রোগে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে।

ডা. লেলিন বলেন, এডিস মশা নির্মূল করতে হলে রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল, শহর, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল—সব জায়গায় একসঙ্গে মশার বাসস্থান, প্রজননস্থল, লার্ভা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা—লক্ষ্য করে কাজ করতে হবে। এ জন্য একদিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান চালাতে হবে। ঘরবাড়ির ভেতরে ও চারপাশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকর মশকনিধন ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। 

তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনও কেন্দ্রীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। বাস্তবায়ন তো অনেক দূরের কথা। আমরা মনে করি, এ ধরনের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে জনসাধারণকে যুক্ত করতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী, রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি ও বেসরকারি অফিস-সংস্থার কর্মী, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং আনসার বাহিনী—সবাইকে যুক্ত করে এ কাজ করতে হবে।

ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আমরা মনে করি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যেখানে সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গু প্রতিবছরই আসবে, মানুষ মারা যাবে। আমরা চাই, এই অন্ধচক্রের অবসান হোক এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সত্যিকার অর্থেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।