ঢাকার বিরক্তিকর যানজট এড়িয়ে চলাচলের সুবিধা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখন ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে পড়েছে। অন্ধকারের সুযোগে একের পর এক অপরাধ–ছিনতাই, অপহরণ এবং সম্প্রতি এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রাতের বেলায় এই উড়ালসড়কটি আসলে কতটা নিরাপদ।
সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁওয়ের এফডিসি ক্রসিং পর্যন্ত ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড সড়কে নিয়মিত পুলিশ টহল নেই। ফলে রাতের বড় অংশই জনশূন্য হয়ে পড়ে এই সড়কটি। তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় গভীর রাতে এ পথে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই সড়কে সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার। ওই দিন পুলিশ এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে। তার মুখ ও হাত সেলোটেপ দিয়ে বাঁধা ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির নাম ইসমাইল। তিনি জামালপুর থেকে গাজীপুর যাচ্ছিলেন। তার কাছে টাকা রয়েছে বুঝতে পেরে একটি বাসের চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ। পরে রাতের নির্জনতার সুযোগ নিয়ে তারা মরদেহটি এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে যায়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনাটি দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যাত্রীরা বলছেন, গভীর রাতে এই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় তারা প্রায়ই নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন।
উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকার নিয়মিত যাত্রী মাহিম ইসলাম বলেন, ‘অফিসের কাজে আমাকে প্রায়ই উত্তরা যেতে হয়। বেশ কয়েকটি ঘটনার পর রাতে যাতায়াত করতে কিছুটা ভয় লাগে। বাসে যাত্রী কম থাকলে সেই ভয় আরও বেড়ে যায়।’
নীরবতার আড়ালে অপরাধ
বনানীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটা প্রথম কোনো নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা নয়। গত তিন বছরে এখানে বেশ কয়েকটি ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এসবের বেশিরভাগই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর প্রকাশ্যে এসেছে।
গত বছরের অক্টোবরে পুলিশ এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে এক অজ্ঞাত তরুণের মরদেহ উদ্ধার করে। এখনো তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি এবং এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি।
এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ার পরপরই এ পথে চলাচলকারী এক ব্যবসায়ীও অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হন।
২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর উত্তরা এলাকায় একটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাড়ি ফেরার সময় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, টোল প্লাজা পার হওয়ার পর ওই ব্যবসায়ীর গাড়িতে টায়ারের সমস্যা দেখা দেয়। গাড়ির গতি কমে গেলে আরেকটি গাড়ি এসে তার পথ আটকে দেয়। ওই গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে নিজেদের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়।
তারা ব্যবসায়ী ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের অপহরণ করে, টাকার ব্যাগ নিয়ে যায় এবং পরে তাদের পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের কাছে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় পরে পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে।
সিসিটিভি আছে, নেই নিয়মিত টহল
যান চলাচল, রাস্তায় থেমে থাকা যানবাহন এবং অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এই সড়কে ওঠার ও নামার পথে র্যাম্পগুলোতেও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছে।
তবে এক্সপ্রেসওয়ের পুরো অংশজুড়ে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল নেই। ফলে কোনো গাড়ি বিকল হয়ে গেলে, দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা কেউ অপরাধীর হুমকির মুখে পড়লে–বিশেষ করে রাতে যখন সড়কের বড় অংশ জনশূন্য থাকে– তখন তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) মো. ফারুক হোসেন সম্প্রতি এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইটও নেই। অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও সড়কবাতি স্থাপনের বিষয়ে আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।’
কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাইলে তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ-কে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ আমাদের কোনো অগ্রগতির কথা জানায়নি। তারা কী কী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে, তা জানতে আমরা কয়েক দিনের মধ্যে নিজেরাই খোঁজ নেব।’
আরও শক্তিশালী নজরদারির দাবি বিশেষজ্ঞদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও জোরালো নজরদারি প্রয়োজন।
তিনি টাইমস-কে বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত পুলিশ টহল বাড়াতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। ‘ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সড়কে ওঠা এবং নামার পয়েন্টগুলোতে আরও কঠোর নজরদারি থাকতে হবে, সন্দেহজনক যানবাহন শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে এবং দুর্ঘটনা ও অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
দায়িত্ব ভাগ
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোনো একক কর্তৃপক্ষের অধীনে নয়; বরং একাধিক থানার মধ্যে ভাগ করা হয়েছে।
এক্সপ্রেসওয়ের প্রবেশ ও বের হওয়ার পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর, কুড়িল, বনানী, মহাখালী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও এফডিসি এলাকা। এসব পয়েন্টের সঙ্গে সংযুক্ত নিচের সড়ক ও এলাকাগুলোর নিরাপত্তা স্থানীয় থানাগুলো তদারক করে। বনানী ও মহাখালী অংশের দায়িত্ব বনানী থানার, আর ফার্মগেট ও তেজগাঁও অংশের দায়িত্ব তেজগাঁও থানার।
তবে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম জানান, পুলিশ থানা থেকে সরাসরি এক্সপ্রেসওয়েতে টহল দেয় না।
তিনি টাইমস-কে বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সার্বিক নিরাপত্তা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দল পর্যবেক্ষণ করে। আমরা শুধু নিচের সড়ক ও এলাকাগুলোর নিরাপত্তা তদারক করি।’