মাসুম খলিলী
পূর্ব ভূমধ্যসাগর আবারও বিস্ফোরণের কিনারায়। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত যখন এই অঞ্চলে আছড়ে পড়ছে, তখন ইসরায়েল প্রকাশ্যে তুরস্ককে জানিয়ে দিয়েছে—সমুদ্রের দূরত্ব কাউকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না।
ইসরায়েলি নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল ইয়াল হারেলের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিছক সামরিক বাগাড়ম্বর নয়। তিনি স্পষ্ট করেছেন, দূরবর্তী কোনো এলাকা থেকে যারা ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা ইসরায়েলি নৌবাহিনীর রয়েছে। একই সঙ্গে ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা তেলআবিব নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছে।
এই বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সমুদ্রে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা বা ‘freedom of action’। তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের বিরোধ এখন আর কেবল গাজা বা রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের মধ্যে সীমিত নেই; এর নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সাইপ্রাসের চারপাশের সমুদ্র, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি সম্পদ এবং সামুদ্রিক আধিপত্য। প্রশ্ন হলো—ইসরায়েল ও তুরস্ক কি সরাসরি সংঘাতে জড়াবে, নাকি একটিমাত্র ভুল হিসাব বা নৌ-চালনার ত্রুটিই বড় যুদ্ধের সূচনা করবে?
যুদ্ধের আসল মঞ্চ গাজা নয়, সমুদ্র?
তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতি দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমান সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বদলে গেছে। সিরিয়ায় দুই দেশের স্বার্থের দ্বন্দ্ব, হামাসের প্রতি আঙ্কারার সমর্থন এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ দুই দেশের মধ্যে আস্থার সেতু পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। স্থলসীমার চেয়ে সমুদ্রের পরিস্থিতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। যুদ্ধজাহাজগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব কয়েকশ মিটার কমে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী, সাইপ্রাসের কাছাকাছি তুর্কি নৌ-তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যদিও সাইপ্রাসের নিকটবর্তী অঞ্চলে দুই দেশের যুদ্ধজাহাজের সম্ভাব্য মুখোমুখি অবস্থানের খবর মূলত ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মাধ্যমেই এসেছে, তবুও এটি স্পষ্ট যে দুই দেশই ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে।
গ্রিস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই সমীকরণে গ্রিস একটি অপরিহার্য উপাদান। এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সামুদ্রিক সীমা, দ্বীপের অধিকার এবং মহীসোপান নিয়ে এথেন্স ও আঙ্কারার পুরোনো বিরোধ রয়েছে। তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ বা Mavi Vatan ধারণার অধীনে সামুদ্রিক পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রিসকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েল ও গ্রিস প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের একটি বৃহৎ বিমান ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ‘Achilles Shield’ নামক এই প্রকল্পে ডেভিডস স্লিইং, স্পাইডার এবং বারাক এমএক্সের মতো উন্নত ইসরায়েলি প্রযুক্তির সমন্বয়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলায় গ্রিস ও ইসরায়েলের এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের শক্তির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের আসল বিস্ফোরক: প্রাকৃতিক গ্যাস
এই সংঘাতের পেছনে কেবল জাতীয়তাবাদ বা সামরিক উচ্চাশা নেই; এর মূলে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। লেভিয়াথান, তামার ও আফ্রোদিতে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর পূর্ব ভূমধ্যসাগর ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আগে প্রশ্ন ছিল কার কাছে কত গ্যাস আছে; এখনকার মূল প্রশ্ন হলো—কে সেই গ্যাস বাজারে পৌঁছাতে পারবে?
তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক ‘এনার্জি হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ইসরায়েল তার গ্যাস ইউরোপীয় বাজারে পাঠাতে উদগ্রীব।
গ্রিস নিজেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের জ্বালানি প্রবেশদ্বার বানাতে চায়।
মিসর ও সাইপ্রাস তাদের নিজ নিজ সামুদ্রিক সম্পদ ও এলএনজি অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সচেষ্ট।
এই পরস্পরবিরোধী স্বার্থ যখন একই সমুদ্রসীমায় মুখোমুখি হয়, তখন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি আর নিছক সামরিক মহড়া থাকে না; তা হয়ে ওঠে অবকাঠামো পাহারার কৌশল।
সাইপ্রাস: ছোট দ্বীপ, বড় বিস্ফোরক
রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সাইপ্রাস এই সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল কেন্দ্র। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রিপাবলিক অব সাইপ্রাসের সামুদ্রিক অধিকারের বিরোধিতায় রয়েছে তুরস্ক, যা উত্তর সাইপ্রাসের তুর্কি সাইপ্রিয়টদের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক সংঘাত ব্রাসেলসকেও সরাসরি ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলবে।
নৌযুদ্ধ হলে প্রথম গুলি কে চালাবে?
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে গ্রে-জোন কনফ্রন্টেশন বা ধূসর অঞ্চলের সংঘাতের ঝুঁকি এখানে অনেক বেশি বাস্তব। একটি যুদ্ধজাহাজ অন্যটির গতিপথ আটকানো, ড্রোন দিয়ে নজরদারি বা সাবমেরিনের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া—যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণমুখী করে তুলতে পারে। তুরস্ক ও গ্রিস উভয়ই ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এবং ইসরায়েল পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়ায় এই অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে ওয়াশিংটন এবং ন্যাটোর সামনে তৈরি হবে এক জটিল কৌশলগত সংকট।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি কৌশল
তুরস্ক তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প—বিশেষ করে ড্রোন ও নৌ প্রযুক্তির উৎকর্ষের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। আঙ্কারা পিছু হটতে নারাজ। অন্যদিকে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি এবং নতুন নিরাপত্তা ফ্রন্ট তৈরি ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক বা ডেটারেন্সের নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই প্রতিরোধমূলক কৌশলই অনেক সময় বিপরীত পক্ষের কাছে হুমকি হিসেবে প্রতিভাত হয়ে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দেয়।
পরিশেষে: স্নায়ুযুদ্ধ নাকি অনিবার্য সংঘর্ষ?
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা বেশি। যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন, সাবমেরিন ও গ্যাস অনুসন্ধান জাহাজের উপস্থিতিতে এই অঞ্চল এখন এক উত্তপ্ত বারুদের স্তূপ। ইসরায়েলের নৌ-হুঁশিয়ারি এবং তুরস্কের অটল অবস্থান পূর্ব ভূমধ্যসাগরে শক্তির নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
এই সমীকরণে একটিমাত্র ভুল হিসাব—একটি যুদ্ধজাহাজের ভুল মোড় বা ভুল সংকেত—পুরো অঞ্চলকে দাবানলে রূপ দিতে পারে। তখন আর গ্যাস বা পাইপলাইনের হিসেব থাকবে না, প্রশ্ন উঠবে কেবল একটাই: কার সমুদ্র?