Image description

ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে যাওয়া বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সময় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে ভেনিসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয়ে হামলা-হেনস্তা করা হয়। তাঁকে জোর করে কিছু স্লোগান বলানোর চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন বাঁধন।

 

ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এই হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজের চরিত্র উন্মোচন করেছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ।

 

এখন প্রশ্ন হলো, ইতালির আইনে এমন ঘটনায় অভিযুক্তদের কী শাস্তি হতে পারে? তাঁরা ইতালিতে বৈধভাবে থাকলে কী হবে, অবৈধভাবে থাকলে কী হবে? আর কেউ যদি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা রিফিউজি হন, তাহলে কি তাঁদের ক্ষেত্রে আলাদা কোনো নিয়ম আছে?

 

ইতালির প্রচলিত আইন কী বলে

 

ইতালির আইনে কাউকে মারধর করা হলে প্রথমেই দেখা হবে, এতে তাঁর শরীরে কোনো আঘাত বা অসুস্থতা তৈরি হয়েছে কি না।

 

যদি কাউকে মারধর করা হয়, কিন্তু তাতে কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা আঘাত তৈরি না হয়, তাহলে সেটি ‘পারকোসে’ বা মারধরের অপরাধ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৩০৯ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

 

 

মারধর, আঘাত, হুমকি বা জোর করে কিছু করানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ইতালির সাধারণ ফৌজদারি আইনেই মামলা হতে পারে। তাঁর নাগরিকত্ব বাংলাদেশি কি না বা তিনি বৈধভাবে বসবাস করছেন কি না, এসব কারণে অপরাধের বিচার প্রভাবিত হবে না।

 

 

কিন্তু মারধরের কারণে শরীরে আঘাত বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হতে পারে। ইতালির পেনাল কোডের আর্টিকেল ৫৮২ অনুযায়ী, সাধারণ ধরনের শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

 

বাঁধনকে জোর করে কিছু স্লোগান বলানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। অভিযোগটি প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু মারধরের অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইতালির আইনে হুমকি দিয়ে কাউকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করাকে ‘ভিওলেনজা প্রিভাতা’ বা ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর জোরজবরদস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

 

তবে বাঁধনের ঘটনায় ঠিক কোন কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। পুলিশ ও প্রসিকিউটরের তদন্ত, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং ঘটনার অন্যান্য প্রমাণের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।

 

হামলাকারী যদি ইতালিতে বৈধভাবে থাকেন?

 

মারধর, আঘাত, হুমকি বা জোর করে কিছু করানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ইতালির সাধারণ ফৌজদারি আইনেই মামলা হতে পারে। তাঁর নাগরিকত্ব বাংলাদেশি কি না বা তিনি বৈধভাবে বসবাস করছেন কি না, এসব কারণে অপরাধের বিচার প্রভাবিত হবে না।

 

 

তবে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি তাঁর ইতালিতে থাকার অধিকার নিয়েও কিছু ক্ষেত্রে আলাদা সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধ বা জননিরাপত্তার বিষয় সামনে এলে বিদেশিকে ইতালি থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

তবে অপরাধের অভিযোগ উঠলেই বৈধ রেসিডেন্স পারমিট বাতিল হয়ে যাবে বা সঙ্গে সঙ্গে ইতালি থেকে বহিষ্কার করা হবে—এমন নয়। এ বিষয়ে আলাদা আইনি প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।

 

কেউ অবৈধভাবে ইতালিতে থাকলে?

 

কেউ যদি ইতালিতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকেন, তাহলেও তাঁর বিরুদ্ধে মারধর বা আঘাতের মামলা হতে পারে। বরং তাঁর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি অভিবাসন আইনের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।

 

এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি তাঁর অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থাও আলাদা করে বিবেচনা করা হতে পারে। ইতালির আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে থাকা বিদেশিকে দেশ থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বহিষ্কার কার্যকর করার জন্য তাঁকে হেফাজতেও রাখা যেতে পারে।

 

তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ‘অবৈধভাবে ইতালিতে আছেন’ বলেই হামলার অপরাধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি বছরের কারাদণ্ড হবে, এমন নয়। হামলার শাস্তি নির্ভর করবে কী ঘটেছে এবং তা কতটা গুরুতরভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার ওপর।

 

অর্থাৎ, এখানে দুটি বিষয় আলাদা:

এক. বাঁধনের ওপর হামলার জন্য ফৌজদারি মামলা ও শাস্তি।

দুই. ওই ব্যক্তি ইতালিতে বৈধভাবে থাকার অধিকার রাখেন কি না, সে বিষয়ে অভিবাসন আইনের ব্যবস্থা।

দুটি বিষয় এক নয়, তবে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুটিই একসঙ্গে সামনে আসতে পারে।

 

 

রিফিউজি বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে বা অ্যাসাইলামে থাকলে কী হতে পারে?

 

অ্যাসাইলাম সিকার হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। কিন্তু তাঁর আবেদন এখনো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি। আর রিফিউজি হলেন যাঁর রিফিউজি মর্যাদা স্বীকৃত হয়েছে।

 

 

২০২৬ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ‘ইইউ রিসেপশন ডিরেক্টিভ’ অনুযায়ী, শুধু কেউ অ্যাসাইলাম সিকার—এই কারণে তাঁকে আটক করা যাবে না। তাঁকে আটক করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি কারণ থাকতে হবে এবং পরিস্থিতি ব্যক্তিভেদে বিবেচনা করতে হবে।

 

অর্থাৎ, অ্যাসাইলাম সিকার হওয়ার কারণে কেউ অপরাধের মামলা থেকে বাঁচবেন না; তবে শুধু আশ্রয়ের আবেদনকারী হওয়ার কারণেও তাঁকে শাস্তিমূলকভাবে আটক করা যাবে না।

 

আর কেউ যদি ইতোমধ্যে রিফিউজি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকেন, তাঁর ক্ষেত্রেও অপরাধ করলে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। তবে শুধু অভিযোগ উঠলেই রিফিউজি মর্যাদা বাতিল হয়ে যায় না।

 

২০২৬ সালের ১২ জুন থেকে প্রযোজ্য নতুন ইইউ রিফিউজি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিশেষভাবে গুরুতর অপরাধে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হন এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সমাজের জন্য বিপজ্জনক হন, তাহলে রিফিউজি মর্যাদা প্রত্যাহারের আইনি ব্যবস্থা হতে পারে। একইভাবে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ থাকলেও মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়টি আসতে পারে।

 

অর্থাৎ, শুধু গ্রেপ্তার বা সাধারণ কোনো অপরাধের মামলা হলেই রিফিউজি মর্যাদা বাতিল হয়ে যাবে, এমন নয়। বিশেষভাবে গুরুতর অপরাধ, চূড়ান্ত সাজা এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক হওয়ার বিষয়—এসব আইনি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ।