একের পর এক খুন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ঘটনার পর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় খুনিরা ধরাও পড়ছে। তারপরও থামছে না খুন খারাবি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন কেবল গ্রেপ্তারই নয় অপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াও দ্রুত করতে হবে। এতে অপরাধ জগতে বার্তা যাবে। শুক্রবার থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত চারদিনে
রাজধানীতে ছয়টি হত্যাকাণ্ড এবং দু’টি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঢাকায় ১২২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। এসব মামলার অধিকাংশ ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন নিহতের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া কলাবাগানে স্ত্রী ও শাশুড়িকে হত্যার ঘটনায় এবং সবুজবাগে বিএনপিকর্মী ইব্রাহীম পলাশ হত্যাকাণ্ডসহ অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ সংঘটনের পর আসামিকে গ্রেপ্তার করাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় নয়। দ্রুত গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। তাদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কিংবা গ্রেপ্তারের পর আসামির দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার সুযোগ অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমিয়ে দিতে পারে। এতে কেউ কেউ পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস পেতে পারে। আইনের শাসন দৃশ্যমানভাবে কার্যকর হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে। একইসঙ্গে অপরাধের তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে।
চারদিনে ছয় হত্যা: শুক্রবার সকালে রাজধানীর বনানী থানাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ইসমাইল হোসেন (৫০) নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জামালপুর থেকে গাজীপুর আসার সময় সুপারভাইজার বাসের ভাড়া চাইলে ইসমাইল কোমরের লুঙ্গির প্যাঁচ থেকে টাকা বের করে দেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা অনেকগুলো টাকা দেখতে পায় সুপারভাইজার। টাকা লুটের জন্য তাকে হত্যা করে মরদেহ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে যায় আসামিরা।
এ ঘটনায় বাসচালক সোহেল রানা (৪০) ও সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৮) এবং হেলপার মোহাম্মদ মনির হোসেন (১৮)কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একইদিন ডেমরায় দেলোয়ার হোসেন (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর শনিবার (৫ই সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাভারের আমিন বাজারের বড়দেশি মদিনা হাউজিং এলাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে এ ঘটনার মূলহোতা প্রাইভেটকারচালক জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া এ ঘটনায় জড়িত ৮ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র্যাব।
শনিবার রাতে একটি অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে গ্যারেজের মালিককে মারধর করা হচ্ছিল। এ সময় এসআই আলতাফ হোসেন তা প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচজন গ্যারেজ মালিকের ওপর হামলা করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়। এ সময় গ্যারেজের মালিককে মারধরকারীদের সঙ্গে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুলের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আলতাফ হোসেন নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে আলতাফ হোসেন দৌড়ে তার ছেলের পোশাক কারখানার ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোটা দিয়ে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুলকে মারধর করে। পরে তাদের উদ্ধার করে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
একইদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর দারুসসালাম থানার মসজিদ গলি এলাকায় জেসমিন আক্তার নামে এক নারীকে গুলি করেন তার স্বামী আব্দুল মান্নান। গুলিটি ওই নারীর ডান হাতের বাহুতে লাগে। ঘটনার পর আব্দুল মান্নানের ছেলে একটি গল্প তৈরি করে। বলে, দুর্বৃত্তরা জানালা দিয়ে গুলি করেছে। কিন্তু তদন্তে জানা যায়, ঘরের ভেতরে গুলির ঘটনা ঘটেছে। আব্দুল মান্নানই ঘরের ভেতর থেকে স্ত্রীকে গুলি করে। অভিযুক্ত আব্দুল মান্নান বেশির ভাগ সময় মাদকাসক্ত থাকতেন। শনিবার রাতেও তিনি মাদকাসক্ত অবস্থায় বাসায় আসেন। মাদক গ্রহণ ও মাদকসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তিনি ঝগড়াবিবাদে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে স্ত্রীকে গুলি করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. আব্দুল মান্নান (৪৫), তার ছেলে মো. রাকিব (২৫) এবং সহযোগী মো. হাতিম মিয়া (২১)কে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৪।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শনিরআখড়া রয়েল হাসপাতালের সামনে ‘লাকী কুকারিজ’ দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ী আসলাম খানকে (৪০) গুলি করে সন্ত্রাসীরা। গুলি তার বাম হাতের কনুইয়ের ওপরে এবং মুখের ডান পাশে লাগে। এ সময় গুলি করে পালানোর সময় সন্ত্রাসী মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে মঞ্জু নামে একজনকে দু’টি পিস্তল ৯ রাউন্ড গুলি একটি কার্তুজ ও খোসাসহ আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। পরবরর্তীতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইকবাল হোসেন কালু নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে।
রোববার সবুজবাগের আদর্শপাড়া বড়ইতলা ব্রিজ এলাকায় নাজিফা শেখ নেহা নামে এক তরুণীর সঙ্গে দেখা করতে এসে ওই তরুণীর সাবেক প্রেমিকের ছুরিকাঘাতে সিফাত উল্লাহ (২৭) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেহা নামে ওই তরুণীর সঙ্গে সাজিদ নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ১লা জুলাই সাজিদকে স্বামী পরিচয় দিয়ে ওই কক্ষটি ভাড়া নেন নেহা। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। নেহা অনলাইনে কাপড় বিক্রি করতেন সেখান থেকে নিহত সিফাতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল। ঘটনার দিন দু’জনের মার্কেটে যাওয়ার কথা ছিল।
রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার ধলপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মো. ইমরান (৩২) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জাকারিয়া (৩৩) নামের আরেক যুবক গুরুতর আহত হন। পুলিশ ও হতাহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা জানান, ইমরান ও জাকারিয়া গতকাল রাত ১০টার দিকে ধলপুরের বাদল সরদারের গলির শেষ মাথায় শরিফের রিকশার গ্যারেজে আড্ডা দিচ্ছিলেন। রাত সোয়া ১০টার দিকে হেলমেট পরা ৬-৭ জন এসে বলতে থাকে, ‘ইমরান দৌড় দিবি না।’ এ কথা বলামাত্র তারা এলোপাতাড়ি গুলি করে। গুলি করতে করতে তারা পালিয়ে যায়। ইমরানের মাথায় গুলি লাগলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। জাকারিয়া হাঁটুতে ও ডান হাতের কব্জিতে গুলিবিদ্ধ হন। ইমরান ঘটনাস্থলেই মারা যান।
সোমবার রাত ১টার দিকে মিরপুর শাহআলী থানা এলাকায় ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান (২৬) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় মেহেদীকে ভোর ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মাহবুব রহমান নামে এক একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে মেহেদীর সঙ্গে মাহবুব রহমান নামে এক ব্যক্তির কথাকাটাকাটি হয়েছিল। একপর্যায়ে মাহবুব তার সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে মেহেদীকে আঘাত করেন। মেহেদীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে মাহবুবকে ধরে ফেলেন। পরে ছুরিসহ তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ডিএমপি। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের আগে সাধারণ মানুষ পুলিশকে জানালে অনেক অপরাধ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ঢাকাকে নিরাপদ করার জন্য ডিএমপি’র প্রতিটা বিভাগে টহল, পেট্রোলিং, ফিক্সড টিমসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আর এসব দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যত্যয় যাতে না হয় সেজন্য প্রতিটি জোনের এসি, এডিসি, ডিসিরা ঘুরে ঘুরে তদারকি করেন। এ ছাড়া সাদা পোশাকেও আমার টিম কাজ করছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে বা তাদের সোর্স ব্যবহার করে, অনেক ঘটনায় তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার করতে পারছে এটা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু অপরাধীকে গ্রেপ্তারই একমাত্র কাজ না। পাশাপাশি তদন্ত, চার্জশিট এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। আইনের শাসন দৃশ্যমানভাবে কার্যকর হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে এবং অপরাধপ্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করলেই হবে না, এটা বিচার অঙ্গন থেকেও দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। কোনো একটা জায়গাতে বা উভয় ক্ষেত্রেই যদি বিলম্ব ঘটে, তখন অপরাধীরা আইনকে ভয় পায় না। তখন সে একের পর এক অপরাধ করে।