সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দাখিলের নিয়ম চালু করে গত অন্তর্বর্তী সরকার। এ নির্দেশনা মেনে হিসাব জমা দেওয়া হলেও তা বিভিন্ন দপ্তর-মন্ত্রণালয়ে লকারবন্দি হয়ে আছে। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের নতুন করে বেতন বাড়ায় তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, সম্পদ ব্যক্তিগত তথ্য। কারও নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে এসব প্রকাশ করা অনুচিত। এতে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়বে। আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব নির্বাচন কমিশন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে পারলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে বাধা কোথায়?
এর আগে পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান ছিল। গত কয়েক দিনে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিসাবপত্র কোথাও লকারবন্দি, কোথাও স্টোররুমে রাখা হয়েছে। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা পেলে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্টরা কাজ করবেন। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন যোগ দিয়েছি। যা স্বচ্ছ এবং ভালো হয় আলোচনা করে সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সম্প্রতি টিআইবি জানায়, যেসব সরকারি চাকরিজীবী প্রতি বছর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন, কেবল তাঁদের বেতন-ভাতা বাড়ানো উচিত। যাঁরা সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন না, তাঁদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রযোজ্য হওয়া অনুচিত। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা মনে করি স্বচ্ছতার জন্য এটি প্রকাশ করা হোক। এতে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে। তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া টিআইবির দাবির বিরোধিতা করে বলেন, এতে সংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরবেন। সম্পদের হিসাব সরকারের কাছে থাকবে, সরকার যাচাইবাছাই করে দেখবে। ভারতে এজন্য আলাদা কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। পৃথিবীর কোথাও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ হয় না। তবে সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুদমার সম্পদের হিসাব লুকায়িত না রেখে প্রকাশের পক্ষে বলেন।
‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ১৩ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, চাকরিতে প্রবেশের সময় প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিতে হবে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন জনপ্রশাসন সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান সব সরকারি কর্মচারীকে সম্পদের হিসাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশাসন ক্যাডার, উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত এবং অন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ। সেখানে ৬ হাজার ৩৬৭ জনের হিসাব জমা পড়েছে। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রাহেদ হোসেন জানান, সম্পদের হিসাব লকারে বন্দি আছে। প্রয়োজন হলে খুলে যাচাই করা হবে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা শিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব জমা দিয়েছেন।
কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তারা কৃষি অধিদপ্তরে হিসাব দিয়েছেন। পুলিশ, আনসার, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাদের কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব জমা দিয়েছেন। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব মো. জসিম উদ্দীন বলেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মরতদের হিসাব মন্ত্রণালয়ে আছে। আর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের হিসাব তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জমা আছে। এ ছাড়া খাদ্য অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, ট্যারিফ কমিশনসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্মচারীদের সম্পদের হিসাবের ফাইলগুলো বস্তায় ভরে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব সেলিম খান বলেন, আমাদের ক্যাডার কর্মকর্তাদের হিসাব জনপ্রশাসনে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের হিসাব মন্ত্রণালয়ে আছে। পরবর্তীতে জনপ্রশাসন যখন যে সিদ্ধান্ত দেবে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর ট্যাক্সের হিসাব সরকারকে দিতে হয়। তার সঙ্গে এখন আলাদা করে সম্পদের হিসাবও দেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সরকার যদি সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার নির্দেশ দেয় তখন তা করা হবে। যদি কিছু যাচাইবাছাই করতে বলা হয়, তা-ও করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এটি সিলগালা থাকাই স্বাভাবিক। কারও নামে কোনো সময় প্রশ্ন উঠলে কর্তৃপক্ষ সম্পদ মিলিয়ে দেখবে। অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন। দশম থেকে ১২তম গ্রেডের কর্মকর্তা ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৩২ জন। এ ছাড়া ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩১৮ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী ৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৫ জন। অন্য কর্মচারী ৭ হাজার ২৮২ জন।