শিক্ষার মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা। ভয়াবহ শিক্ষকসংকট, অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও তদারকির অভাবে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য ৩৬ হাজার ২৩৫। সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য প্রায় ২০ হাজার। কোথাও ভবন আছে, শিক্ষক নেই। কোথাও শিক্ষক আছে, পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। কোথাও একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। আবার কোথাও শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকলেও পড়াশোনার অবস্থা খুবই করুণ। এমন বিদ্যালয়ও আছে যেখানে বছরের পর বছর কেউ বৃত্তি পাচ্ছে না। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। অনেক বিদ্যালয়ে হচ্ছে না বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে কমছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, বাড়ছে ঝরে পড়ার হার। বিপরীতে বেসরকারি ভালো বিদ্যালয়ে চলছে ভর্তিযুদ্ধ।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিক্ষার মূল ভিতটাই গড়ে ওঠে প্রাথমিকে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে বাচ্চারা পড়ে। তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে মোটিভেশন করার বিষয় আছে। এজন্য এখানে শুধু শিক্ষক নিয়োগই যথেষ্ট নয়, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মেধাবীরা আগ্রহী হন এবং তারা শিশুদের পেছনে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন। এ ছাড়া এই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে।
৫৬ হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য : প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদ ৬৫ হাজার ৫০২টি এবং সহকারী শিক্ষক পদ ৩ লাখ ৬৪ হাজার ২৯টি। সর্বসাকল্যে শিক্ষক পদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি। এর মধ্যে গত রবিবার কর্মরত ছিলেন ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। ফলে মোট শূন্য পদের সংখ্যা ৫৬ হাজার ৩৯৫টি, যা অনুমোদিত পদের প্রায় ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদই শূন্য ৩৬ হাজার ২৩৫টি (৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ)। গত বছরের জুলাইয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য ছিল ৩৪ হাজার ১০৬টি, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ হাজার ১২৯টি। এর বাইরে সহকারী শিক্ষক পদও ফাঁকা রয়েছে ২০ হাজারের বেশি।
দুই শিক্ষক চালাচ্ছেন এক স্কুল : ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র শিক্ষক সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি। কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। দুই শিক্ষককে পাঁচটি শ্রেণির পাঠদান করতে গিয়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাঠদান। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাদ্দাম হোসেন জানান, স্কুলটিতে ডেপুটেশনে শিক্ষক দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শিক্ষক পাওয়া যায়নি।
এক বছরেই ময়মনসিংহে ঝরেছে লক্ষাধিক শিশু : ময়মনসিংহের ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ৮৫৩টি। শিক্ষকসংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে শিক্ষার্থীও। জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী কমেছে গফরগাঁও উপজেলায়। এমন পরিস্থিতিতে গত ২ জুলাই শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এক রায়ের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, মামলা জটিলতা কাটায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য থাকা প্রধান শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করা হবে। অবিলম্বে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদেও নিয়োগ দেওয়া হবে।
শিক্ষকসংকট সর্বত্র : বিভিন্ন জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ায় ৮০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। খুলনায় ১ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে, গাজীপুরের ৭৭৬টির মধ্যে ২৯৩টিতে, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টির মধ্যে ৩৪৩টিতে, ফরিদপুরের ৮৮৮টির মধ্যে ৫১৫টিতে, রাজবাড়ীর ৪৮১টির মধ্যে ২৭৯টিতে এবং বান্দরবানের ৪৩৫টির মধ্যে ১৭৪টিতে, রাজশাহীর ১ হাজার ৫৭টির মধ্যে ৫৮৯টিতে এবং রংপুরের ১ হাজার ৪৫৫টির মধ্যে ৬৬৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বরিশাল বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এ বিভাগে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি। সারা দেশেই একই অবস্থা।
থেমে গেছে বৃত্তি : নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। অনেকগুলোতে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এর মধ্যে কয়েকটি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না বার্ষিক ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বৃত্তি প্রদানে ৮০ ভাগ কোটা সরকারি স্কুলের জন্য বরাদ্দ থাকলেও এসব স্কুলের অনেকগুলোতে বছরের পর বছর কেউ বৃত্তি পায়নি। এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ৮০ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে, ২০ ভাগ পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু বয়স নয়, অনেকগুলো বিষয় দেখা হবে। এখন থেকে নিয়মিত প্রাথমিকের শূন্য পদ পূরণ করা হবে।
অক্টোবরে যোগদান করবেন ১৪ হাজার শিক্ষক : প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সহকারী শিক্ষক পদে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসহ নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারীদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা করা হচ্ছে। প্রতিদিন মাঠপর্যায় থেকে তালিকা আসছে, সেগুলো সফটওয়্যারে ইনপুট দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর তালিকা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হবে। পদোন্নতির পর সহকারী শিক্ষক পদের শূন্যতা পূরণেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর তারা যোগদান করবেন।
শূন্যপদ পূরণে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা সরকারের : প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ‘প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন। এর মধ্যে সাড়ে ৩২ হাজার পদ একটি মামলায় আটকে ছিল। সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছিল না। গত জুলাইয়ে পদোন্নতি নিয়ে আইনি জটিলতা দূর হয়েছে। এখন শূন্যপদ পূরণে কীভাবে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া যায় তা নিয়ে আমরা সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করছি। আশা করছি আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে পারব। সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পর দ্রুত সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করা হবে।’ বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ৮-৯ বছর আগে কিছু শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন, অনেকে মারা গেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি স্থগিত : নতুন করে নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের পদায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম স্থগিত করেছে সরকার। নতুন শিক্ষকদের পদায়নের পর বদলি আবার চালু করা হবে। তবে তখন বর্তমান নীতিমালায় বদলি হবে, নাকি নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করা হবে-সেই সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে। গতকাল আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, নতুন শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদায়নের জন্যই আপাতত সব ধরনের বদলি স্থগিত করা হয়েছে।