Image description

চোখের সামনে শুধু টাউন খাল। এই খাল নিয়ে নানা প্ল্যান-পরিকল্পনা। কিন্তু শত চেষ্টাতেও সচল হয়নি খালের প্রবাহ। ভেস্তে গেছে অনেক টাকাকড়ি। ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের প্রায় বেশির ভাগ অংশই ভরাট-দখলে অস্তিত্বহীন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদায়ী জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান গত মার্চ মাসে খালকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা খালের পূর্বাংশের ৫শ’ মিটার পরিষ্কার করা হয়। এতে তিতাস নদী থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত খালে পানি প্রবাহ ফিরে আসে ঠিকই। কিন্তু বাদবাকি অবস্থার কারণে একসময়ের স্রোতস্বিনী এই খাল অকার্যকরই থেকে গেছে। টাউন খাল ছাড়া শহরে আরও অনেক খালই অস্তিত্বহীন। ভূমির রেকর্ডপত্র অনুসারে- শহরের বিভিন্ন মৌজায় ৪৫টি খালের অস্তিত্ব দেখা যায়। যদিও এগুলোর এখন নাম নিশানা নেই। নানাভাবে বেদখল হয়েছে সেগুলো। শহরের কালীবাড়ী মোড় থেকে শিমরাইলকান্দি রাজঘাট পর্যন্ত বড় একটি খাল এলাকার প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।

স্থানীয়রা জানান, তিতাস নদী থেকে আসা এই খালের অস্তিত্ব ছিল এরশাদ শাসনামলের আগ পর্যন্ত। নৌকা চলাচল ছিল। তাছাড়াও জেলা পরিষদের সামনে, স্টেশন রোডের পাশেও ছিল খাল। কিন্তু হায়! খাল কোথায়? সরজমিন শিমরাইলকান্দি পাওয়ার হাউজ রোডে গিয়ে খাল বলতে কোনো কিছুই চোখে দেখা যায়নি। এমন অবস্থা অন্যখালগুলোরও। বর্তমান সরকার খাল খননের উদ্যোগ নিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা থেকে ৮টি খালের তথ্য প্রেরণ করা হয়। এগুলো হচ্ছে- টাউন খাল, পুলিশ ফাঁড়ি খাল, মেড্ডা শ্মশান খাল, পশ্চিম ফুলবাড়িয়া খাল, ভাদুঘর বাজার খাল, ভাদুঘর কাটা খাল, পাইকপাড়া ননীশাহর বাড়ির পাশের খাল ও পাওয়ার হাউজ রোড সংলগ্ন খাল। তবে এই খালগুলোকে নিষ্কাশন খাল হিসেবেই দেখানো হয়েছে।

পৌরসভার তথ্য অনুসারে, নৌকা চলাচল করতো এমন ৩টি খাল ড্রেনে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে সেকেন্ডারি টাউন ইনফ্রাস্টকচার ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট-২ এর আওতায় ড্রেন হিসেবেই সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়। কাজীপাড়া জেলা ঈদগাহ্ মাঠ থেকে শিমরাইলকান্দি রেলগেইট সংলগ্ন তিতাস নদী পর্যন্ত খাল, বিরাশার থেকে মেড্ডাবাজার সংলগ্ন তিতাস নদী পর্যন্ত খাল (পুলিশ ফাঁড়ি খাল হিসেবে পরিচিত) এবং তিতাস নদীর মেড্ডা শ্মশান ঘাট থেকে সিও অফিস পর্যন্ত খালকে ড্রেনে পরিণত করা হয়। অথচ এসব খাল দিয়ে ইট-বালুর নৌকা চলাচল করেছে ৯০ দশক পর্যন্ত। এখন স্লেব দিয়ে ড্রেনের ওপরের অংশও দখল করে নেয়া হয়েছে।

পৌরসভার এক কর্মকর্তা বলেন- মুশকিল হয়েছে বাড়ির মালিকরা পাকা স্ল্যাব করে ড্রেন ঢেকে ফেলেছে। এর ওপর দিয়ে তারা চলাচল করছেন। ফলে পৌরসভার শ্রমিকরা এসব ড্রেন পরিষ্কার করতে পারছে না। এতে করে মেড্ডা মার্কাস পাড়া, বিরাশার, মেড্ডা উত্তর এলাকা, ঈদগাহ্ মাঠ, মোড়াইল, কাজীপাড়া এবং বণিকপাড়া এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের এক তালিকায় শহরে খাল দেখানো হয়েছে ৬টি। সেগুলো হচ্ছে- টাউন খাল, বাটার (বাতার) খাল, কুরুলিয়া খাল পূর্ব ও পশ্চিমাংশ, গোকর্ণ খাল, বারবিতা খাল। শহরের খালগুলোর মধ্যে অবশ্য একমাত্র শহরের দক্ষিণভাগে থাকা কুরুলিয়া খালই পুরোপুরি সচল রয়েছে।

তবে বিএস খতিয়ান অনুসারে শহরের বিভিন্ন মৌজায় খাল রয়েছে ৪৫টি। এরমধ্যে পশ্চিম নয়নপুর মৌজায় ৩টি খাল ও ১টি নালা, পুনিয়াউট মৌজায় ৩টি খাল, পশ্চিম দাতিয়ারায় ১টি খাল, পৈরতলা মৌজায় ৬টি খাল, পশ্চিম পাইকপাড়ায় ২টি খাল, মৌড়াইল মৌজায় ৩টি ড্রেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মৌজায় ৬টি খাল, ভাদুঘর মৌজায় ২৪টি খাল রয়েছে। তবে ভাদুঘরে এখন এতো পরিমাণ খাল আছে কিনা জানতে চাইলে অবাকই হন স্থানীয়রা। ভাদুঘরের সাবেক পৌর কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম নেহার বলেন, এতো খাল কোত্থেকে। ভাদুঘর থেকে কাঞ্চনপুর পর্যন্ত একটি খাল দেখা যায়, আরেকটি বাজারের দক্ষিণ পাশ থেকে এলহামপাড়া বরাবর পর্যন্ত আসছে। এতো খাল নেই। সাবেক পৌর কাউন্সিলর আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তাদের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে দক্ষিণ এলহামপাড়া থেকে ঋষিপাড়া হয়ে তিতাস নদীতে গেছে একটি খাল। আমার জানামতে এটাই রেকর্ডের খাল। এটিও আগের মতো নেই। আর ভাদুঘর ১১ নম্বর ওয়ার্ডে দেওয়ান পাড়া থেকে তিতাস নদী পর্যন্ত আরেকটি খাল আছে। খাল এখন রাস্তা হয়ে গেছে।

জেলায় ৪৫৯ খাল: গত এপ্রিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বদলি হয়ে যাওয়ার আগে জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান জেলার খালের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। যাতে জেলায় ৪৫৯টি খাল থাকার তথ্য রয়েছে। এতে খালগুলোর আয়তন এবং বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এসব খালের মধ্যে ৮/১০টি ছাড়া বেশির ভাগ খাল খননের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। এদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলায় ২১টি খাল খননের কাজে হাত দেয়া হয়। এরমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে ৩টি, আশুগঞ্জে ৩টি, নাসিরনগর, বিজয়নগর ও আখাউড়ায় ১টি করে, নবীনগরে ৬টি, কসবায় ২টি এবং বাঞ্ছারামপুরে ৪টি খাল খনন শুরু হয়। এর মধ্যে ১১টি খালের খনন কাজ শেষ হয়েছে বলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কার্যালয় থেকে জানানো হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, এলজিইডি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখার মাধ্যমে এসব খাল খনন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।