সড়ক নিরাপত্তায় একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, ব্যয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। হচ্ছে সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে সড়ক নিরাপত্তার নানা বিষয়ে নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ। কিন্তু এসব আয়োজন ও প্রকল্প থেকে পাওয়া শিক্ষা বাস্তবে কতটা কাজে লাগছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তার ভাষায়, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকতা খুব ভালো হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন ও শেখার জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে যাচ্ছি।
আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার ও দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথাবলেছেন মন্ত্রী।
সড়ক নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর সুফল মূল্যায়নের তাগিদ দিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, এসব প্রকল্পে শুধু অর্থ ব্যয় করলেই হবে না, প্রকল্প থেকে কী শেখা গেল এবং সেই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করা হলো কি না, সেটিও দেখতে হবে। তা না হলে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
শেখ রবিউল আলম বলছিলেন, ‘আমরা কত টাকা ব্যয় করছি, তার হিসাব আছে। কিন্তু অর্জন কতটা হচ্ছে, সে বিষয়ে জনগণের জিজ্ঞাসা আছে। এতদিন যা শিখছি, এত ব্যয় করে যা শিখছি, তার বাস্তবায়ন পাচ্ছি কি না, সেটি দেখতে হবে।’
সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আরও দুটি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছেন, যার ব্যয় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এসব প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে চান তিনি।
মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘আমি অন্তত এই ৮০০ কোটি টাকার একেবারে সুফল চাই, সঠিক চাই। আমরা শিখতে পারছি না, বাস্তবায়ন করতে পারছি না—এই উপলব্ধিটা অর্জন করার জন্য আপনাদের কাছে আমার আবেদন।’
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, কোথায় কত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এর কারণ কী—এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
ভবিষ্যতে যেসব বড় প্রকল্প ও সড়ক নির্মাণ করা হবে, সেসব ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনার তথ্য কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। একটি সড়কে দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত হওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা যেন নতুন প্রকল্পের নকশা ও নির্মাণে কাজে লাগে, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
সড়ককে শুধু চলাচলের পথ হিসেবে না দেখে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন শেখ রবিউল আলম। সড়ক নির্মাণের সময় থেকেই এর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেছেন, সড়ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংস্কারের জন্য প্রকল্প নেওয়ার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আগেই সংস্কার করলে সড়ককে ভালো রাখা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব।
‘রাস্তাটা পর্যাপ্ত না ভাঙা পর্যন্ত প্রকল্প নেওয়া হবে না, এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আগেই সংস্কার করলে সম্পদটা সংরক্ষণ করা যায়’, যোগ করেন শেখ রবিউল আলম।
সড়ক নিরাপত্তার জন্য পুলিশের একটি বিশেষায়িত বিভাগ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন মন্ত্রী। তার মতে, এই বিভাগের সদস্যদের সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। তাদের দায়িত্বও স্থায়ী হওয়া উচিত, যাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়।
শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ‘পুলিশের এমন একটা বিভাগ থাকা দরকার, যারা রোড সেফটি ও রোড ম্যানেজমেন্ট বোঝে, জানে এবং সেখানেই থাকবে। তারা প্রশিক্ষণ নেবে, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করবে।’
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দক্ষ চালক তৈরি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে সড়ক ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানান।
ফিটনেসযুক্ত বাহন নিশ্চিত করা, দক্ষ ও যোগ্য ড্রাইভার নিশ্চিত করা, গতি নিয়ন্ত্রণ করা, হেলমেট নিশ্চিত করা এবং জনগণকে সচেতন করা ছাড়া রোড সেফটি নিশ্চিত করা কঠিন’, মত প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেছেন, কারও ভুল, স্বেচ্ছাচারিতা বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে মানুষের প্রাণহানি মেনে নেওয়া যায় না। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হতে হবে।
সবশেষে সড়ক নিরাপত্তার উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকতার বদলে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকতা বাংলাদেশে খুব ভালো হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করার জায়গায়, শেখার জায়গায় গিয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে যাচ্ছি। এই ধারার পরিবর্তন না হলে খুব বেশি কার্যকর হবে না।’
কর্মশালায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, হাইওয়ে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।