চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট–সুবিধা দিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছিল স্যাটেলাইটভিত্তিক স্টারলিংক সেবা। চারটি আন্তনগর ট্রেনে বসানো হয়েছিল ৬০টির মতো রাউটার। তবে কয়েক মাস না যেতেই এর ৪৫টি চুরি হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে একটি অ্যানটেনা।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছরের ১৩ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো চারটি ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চ গতির স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। ট্রেন চারটি হলো আন্তনগর পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস।
এ সেবায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিএসসিএল। পরীক্ষামূলক এ উদ্যোগে শুরুতে যাত্রীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যায়। উদ্দেশ্য ছিল, ট্রেনযাত্রীদের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট–সুবিধা দেওয়া কতটা কার্যকর এবং দীর্ঘ যাত্রায় এই সেবা কতটা টেকসই, তা পরীক্ষা করা। প্রাথমিকভাবে যাত্রীদের বিনা মূল্যে এই ইন্টারনেট–সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল।
ট্রেন চারটি হলো আন্তনগর পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস।
একের পর এক রাউটার চুরি
বিএসসিএল সূত্র বলছে, গত রোজার ঈদের পর থেকেই চারটি ট্রেনে রাউটার চুরি হতে শুরু করে। শুরুতে প্রতিটি বগিতে দুটি করে রাউটার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চুরি বাড়তে থাকায় কোনো কোনো বগিতে একটি করে রাউটার দিয়ে সেবা চালাতে হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রমতে, চুরি হওয়া যন্ত্র একসঙ্গে সব প্রতিস্থাপন করা হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো দুটি, কখনো চারটি করে নতুন রাউটার বসানো হয়েছে। কিন্তু নতুন করে বসানো যন্ত্রও সব সময় নিরাপদ থাকেনি।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু রাউটার নয়, এর সঙ্গে সংযুক্ত তার ও কেব্ল চ্যানেলিংও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
চারটি আন্তনগর ট্রেনে স্থাপন করা ৬০টি রাউটারের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে ১৫টি। এ ঘটনায় পরীক্ষামূলক সেবার মূল অবকাঠামো অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত তিন মাসে বিভিন্ন রুটের ট্রেনের চুরি হওয়া রাউটার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে চুরি থামানো যায়নি। তাই এবার চুরি ঠেকাতে রাউটার ও অ্যানটেনা স্থাপনের পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা
ট্রেনে থাকা স্টারলিংক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়মিত তদারক করেন বিএসসিএলের কর্মকর্তারা। সেই তদারকির সময় সম্প্রতি বড় ধরনের চুরির ঘটনা তাঁদের নজরে আসে।
সম্প্রতি উপবন এক্সপ্রেসের একটি স্টারলিংক অ্যানটেনা থেকে অকার্যকর সিগন্যাল পাওয়ার পর বিষয়টি সরেজমিন খতিয়ে দেখে বিএসসিএলের একটি দল। ট্রেনের ছাদে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, অ্যানটেনাটি নেই, আছে শুধু অ্যানটেনা বসানোর হোল্ডার।
বিএসসিএলের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি রাউটারের দাম ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর একটি অ্যানটেনার দাম দুই লাখ টাকার বেশি।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমাদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যন্ত্রপাতি চুরি ঠেকানো না গেলে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া চ্যালেঞ্জ হবে।
সম্প্রতি উপবন এক্সপ্রেসের একটি স্টারলিংক অ্যানটেনা থেকে অকার্যকর সিগন্যাল পাওয়ার পর বিষয়টি সরেজমিন খতিয়ে দেখে বিএসসিএলের একটি দল। ট্রেনের ছাদে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, অ্যানটেনাটি নেই, আছে শুধু অ্যানটেনা বসানোর হোল্ডার।
রাউটারগুলো কারা নিয়ে গেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে। এ বিষয়ে জানতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী (টেলিকম) সৈয়দ মো. শাহিদুজ্জামান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, চলন্ত ট্রেনে চুরি নিয়মিতই ঘটে। এ ধরনের চুরি ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রেলের এই কর্মকর্তার ভাষ্য, অনেক সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ধাতব কোনো যন্ত্রাংশ দেখে এর প্রকৃত মূল্য না জেনেই তা চুরি করে অল্প দামে বিক্রি করে দেন।
রাউটার–অ্যানটেনা স্থাপনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে
রেলে স্টারলিংক সেবার এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত তিন মাসে বিভিন্ন রুটের ট্রেনের চুরি হওয়া রাউটার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে চুরি থামানো যায়নি। তাই এবার চুরি ঠেকাতে রাউটার ও অ্যানটেনা স্থাপনের পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এই উপদেষ্টার ভাষ্য, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, রেলে নতুন করে যে ৫০টি বগি যুক্ত হবে, সেখানে রাউটারগুলো বগির মূল অবকাঠামোর ভেতরের অংশে স্থাপন করা হবে। আর অ্যানটেনা সাধারণ বগির ছাদের বদলে ইঞ্জিন বগির ছাদে স্থাপন করা হবে।