২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় বড় ভাই রিফাতের সঙ্গে রাজধানীর পল্লবীর হাজীমার্কেটসংলগ্ন বাসার সামনে খেলছিল তিন বছরের রূপা আক্তার। মাগরিবের আজান কানে আসতেই ছোট বোনকে সেখানে রেখেই নামাজ পড়তে যায় রিফাত। ফিরে এসে রিফাত দেখে, রূপা নেই। রিফাত ভেবেছিল, হয়তো রূপা বাসায় চলে গেছে। অন্যদিকে রূপার মা স্বপ্না আক্তারও ভেবেছিলেন, মেয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গেই বাসার সামনে খেলছে। কিন্তু রিফাতকে একা বাসায় ফিরতে দেখে মেয়ের কথা জানতে চান স্বপ্না।
রিফাতও উল্টো মাকে জিজ্ঞেস করে, রূপা কোথায়? সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় খোঁজ। প্রতিবেশীদের বাসা, আশপাশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা-সবখানেই তন্নতন্ন করে খোঁজা হয় ছোট্ট রূপাকে। মাইকিং করা হয় পুরো এলাকায়। কোথাও মেলেনি সন্ধান। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না পেয়ে থানা-পুলিশের কাছে যায় পরিবারটি। এক বছর পার হয়ে গেলেও রূপার খোঁজ মেলেনি। সন্তান কোথায়, কেমন আছে-এ প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আজও অপেক্ষায় আছেন মা স্বপ্না আক্তার। অপেক্ষায় দিন গুনছে ভাই রিফাত ও পরিবারের অন্য স্বজনরাও। ঘটনাটি বর্ণনা করে একমাত্র মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন স্বপ্না।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ আকুতি জানান স্বপ্না আক্তার। মুন অ্যালার্টের (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) আয়োজনে সংবাদ সম্মেলনটি করে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গ। একে একে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা মঞ্চে উঠছেন, আর চোখের পানি মুছতে মুছতে মঞ্চ ছাড়ছেন। চলতি বছরের ২৮ মার্চ দক্ষিণখান থেকে নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের শিশু আরাফাত হোসেন রিয়াদ। কোথাও না পেয়ে দক্ষিণখান থানায় জিডি করতে যান রিয়াদের বাবা মো. আনোয়ার হোসেন।
পুলিশ জানায়, ২৪ ঘণ্টা পর আসবেন, এই সময় খুঁজে দেখেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায়ও রিয়াদকে না পেয়ে ফের থানায় যান তিনি। এবার পুলিশ জিডি নিতে গড়িমসি করতে থাকে। পরে অনেক অনুরোধ করার পর জিডি নেয়। কিন্তু জিডি দায়েরের চার মাসের বেশি সময় হলেও একবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি, তদন্তের জন্য আসেনি। নিজেরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুলিশ উল্টো বলে, ‘এত বড় বাচ্চা এমনে এমনে চলে যাওয়ার কথা নয়; নিশ্চয়ই আপনারা বাচ্চাকে চাপ প্রয়োগ করতেন।’ সন্তানকে ফিরে পেতে সহায়তা চেয়ে পুলিশের কাছে যেন আমরা আসামি হয়ে গেলাম, এমনটি জানান রিয়াদের বাবা আনোয়ার হোসেন।
২০০৮ সাল থেকে আট বছর বয়সি তানজিলাকে খুঁজে ফিরছে তার পরিবার। লালবাগের শহীদনগরে মামাতো ভাইদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সে। টানা ১০ দিন ঢাকাজুড়ে মাইকিং ও পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মেলেনি সন্ধান। দুই ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোনকে হারিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভাই মো. শাকিল। তিনি জানান, বাবা মারা গেছেন, মা এবং ছোট ভাই সৌদিপ্রবাসী। মায়ের অনুপস্থিতিতে তানজিলা মামার কাছে থাকত। নিখোঁজের পর পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েও কোনো সহযোগিতা পাননি তাঁরা। আক্ষেপ করে শাকিল বলেন, নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা কি শুধু পরিবারের দায়িত্ব, নাকি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে? তিনি বলেন, প্রভাবশালী কারও সন্তান নিখোঁজ হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান হয়; কিন্তু সাধারণ পরিবারের সন্তান নিখোঁজ হলে তাদের কথা শোনারও কেউ থাকে না। তানজিলাকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পৃথক একটি ইউনিট গঠনের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্তত ৪০টি পরিবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর নিখোঁজ সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও প্রিয় সন্তানের খোঁজ পায়নি তারা। পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও পদে পদে হয়রানি আর পুলিশের চরম উদাসীনতার অভিযোগও তুলে ধরেন অনেকে। শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের কথাই নয়; নিখোঁজের পর পুলিশের সহায়তা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরে কয়েকটি পরিবার।
মুন অ্যালার্টের প্রতিষ্ঠাতা সাদাত রহমান বলেন, মুন অ্যালার্টের সদস্যরা থানা থেকে নিখোঁজসংক্রান্ত জিডির কপি সংগ্রহ করেন এবং মুন অ্যালার্টে পোস্ট করেন। নিখোঁজ পরিবারের সঙ্গেও তাঁরা যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। এভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ ও অপহরণের শিকার শিশুকে তারা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।