একমাত্র মেয়ে শারমিনের বিয়ের খরচ জোগাতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জমি বিক্রি করেছিলেন ইসমাইল হোসেন (৫০)। জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা নগদ সঙ্গে নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরের বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। কথা ছিল, বাড়ি ফিরেই একমাত্র মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করবেন। তবে বাড়ি ফেরা হয়নি তার। রাজধানীর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে শুক্রবার (৪ঠা সেপ্টেম্বর) স্কচটেপ দিয়ে মুখ বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। স্বজনদের দাবি, তার সঙ্গে থাকা ৫ লাখ নগদ টাকা ও দু’টি মোবাইল ফোনও পাওয়া যায়নি। নিহত ইসমাইল হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুরের করলাপাড়া এলাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করতেন।
স্বজনরা জানিয়েছেন, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে ছেলে হাসানকে ফোন করে জানান, শুক্রবার ভোরে গাজীপুরের জিরানীতে পৌঁছাবেন। সেই অনুযায়ী ছেলে হাসান শুক্রবার সকালে বাবাকে নিতে আশুলিয়ার জিরানীতে বাসস্ট্যান্ডে যান এবং অপেক্ষা করতে থাকেন বাবার জন্য। কিন্তু সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাবার দেখা পাননি। হাসান অনেকবার ফোন দেয় বাবার নম্বরে কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্বজনদের ধারণা, পথে তার সঙ্গে থাকা টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডেল্টা স্পিনিং মিলে সিকিউরিটি নিরাপত্ততাকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন ইসমাইল। চাকরি ছাড়ার পরেও গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করতেন। মেয়ে শারমিনের বিয়ের খরচ জোগাড় করতে প্রায় চার মাস আগে স্ত্রী-সন্তানদের রেখে গ্রামের বাড়িতে যান তিনি। সেখানে তার মা ও বড় বোন থাকেন। পরে সাড়ে ১০ লাখ টাকায় ১১ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। সেই টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেন এবং কিছু টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঘর নির্মাণ করেন।
বাকি ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। ঐদিন রাত ১১টার দিকে ছেলে হাসানকে ফোন করে জানান শুক্রবার ভোরে গাজীপুরের জিরানীতে পৌঁছাবেন। সেই অনুযায়ী ছেলে রাসেল সকালে জিরানীতে গিয়ে বাবা আসছে না দেখে অনেকবার ফোন দেয় বাবার নম্বরে কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বনানী থানা থেকে বিষয়টি জামালপুর পুলিশকে জানানো হয়। সেখান থেকে খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে বাবার মরদেহ শনাক্ত করেন ছেলে হাসান।
নিহতের ছেলে মো. হাসান বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামে। বর্তমানে তারা গাজীপুরের কাশিমপুরের করলাপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। বাবা ইসমাইল আগে একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় নয় মাস আগে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। তার ছোট বোন শারমিনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল ।
তিনি আরও বলেন, বাবা এসেই বিয়ের চূড়ান্ত তারিখ ঠিক করার কথা ছিল। বোনের বিয়ের খরচ জোগাতে জমি বিক্রির জন্য প্রায় চার মাস আগে গ্রামের বাড়িতে যান বাবা। গ্রামের ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন বলে জানান- নিহতের ছেলে হাসান। তিনি বলেন, এর মধ্যে আগের ২ লাখ টাকার ঋণ শোধ করেন। কিছু টাকা দিয়ে গ্রামে একটি ঘর নির্মাণ করেন। বাকি ৫ লাখ টাকা নগদ নিয়ে এবং কিছু বাজার করে গাজীপুরে আসছিলেন তিনি। সাথে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোনও ছিল, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। সকালে ইসমাইলের গাজীপুরের জিরানীতে নামার কথা ছিল। বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার দিকে বাবা আমাকে ফোনে জানান, সকালে তিনি এসে পৌঁছাবেন। তখন বাবা জানিয়েছিলেন, রাত ৩টার বাসে জামালপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। সেই অনুযায়ী আমি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাবাকে নিতে আশুলিয়ার জিরানী বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখানে গিয়ে বাবাকে ফোন করলে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাসায় ফিরে যাই। এরপর পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি বাবার মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর পাওয়া গেছে।
নিহতের ভাতিজা মো. মোকাদ্দেস বলেন, ইসমাইলের জামালপুর থেকে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল। সেক্ষেত্রে তার ঢাকায় আসার কোনো কারণ ছিল না। আমার ধারণা, পথে কোনো ছিনতাইকারী বা চক্র তার সঙ্গে টাকা থাকার বিষয়টি জানতে পেরে তাকে অপহরণ করে। পরে হত্যা করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে মরদেহ গোপন করার জন্য এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রেখে যেতে পারে।
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি (ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ইসমাইলকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। পরে কোনো একটি গাড়ি থেকে তার মরদেহ এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেয়া হতে পারে। গাড়িগুলো আটক করা গেলে ঘটনার রহস্য উদ্?ঘাটন করা যাবে।
এর আগে শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে রাজধানীর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উপর থেকে প্রথমে অজ্ঞাত পরিচয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ। পরে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার পরনে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের শার্ট ও লুঙ্গি ছিল। মুখ সাদা রঙের স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা ছিল । উদ্ধার করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনেরা ইসমাইলের মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।