ইরান-ইউএস যুদ্ধকে ‘গোল আলু’র সঙ্গে তুলনা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, এটা কোনো যুদ্ধই না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা বিচ্ছিন্ন ও বিরতিহীন হামলাকে ‘যুদ্ধ’ বলা যাবে না— ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের এমন দাবির পক্ষেও তিনি যুক্তি তুলে ধরেন। তবে ছোট আলু বলতে কী বুঝিয়েছেন, তার ব্যাখ্যা দেননি। তবে অনেকে বলছেন, ছোট একটি যুদ্ধকেই বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। গতকাল শনিবার ট্রাম্পের এ মন্তব্যকে ফলাও করে প্রকাশ করেছে এপি।
ওভাল অফিসে আলাপকালে ভ্যান্সের আগের দিনের মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এখন ‘মাঝেমধ্যে’ হচ্ছে এবং ‘অনেকেই একে যুদ্ধ বলে মনে করেন না।’ এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভ্যান্স যা বলছেন তা আমি বুঝতে পারছি।’ তিনি আরও যোগ করেন: ‘আমি একে সামরিক সংঘাত বলি— কারণ আমাদের কাছে এটি সামান্য বিষয়। এটি কোনো বড় ঘটনা নয়।’
গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। পাশাপাশি, ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই শেষ হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো পূর্বাভাস দেওয়া থেকেও তিনি বিরত থাকেন। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে তাদের সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে; কিন্তু অধিকাংশ জরিপ বলছে, অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের কারণে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো করবে। কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দেওয়ার আগেই এ লড়াই শেষ হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বললেন, ‘আমি একে যুদ্ধ বলব না। বর্তমানে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি বা যুদ্ধাবস্থা নেই।’
গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আরও বলেছেন, সাম্প্রতিক অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুধু বিমান হামলা চালিয়েছে; তারা দেশটিতে কোনো স্থলসেনা মোতায়েন করেনি।
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে ফেডারেল মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসার লক্ষ্যে জানুয়ারি মাসে চালানো মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা ভেনেজুয়েলার বিষয়টি দেখেছি এবং এটার (ইরান পরিস্থিতি) ক্ষেত্রেও পদক্ষেপ নিয়েছি। ভেনিজুয়েলায় আমাদের কেউ মরেনি। আর এক্ষেত্রে ইরানে আমরা ১৮ জনকে হারিয়েছি। অথচ ভিয়েতনাম যুদ্ধে ১ লাখ মানুষকে হারিয়েছিলাম। অন্যান্য সংঘাতেও আমরা হাজার হাজার মানুষকে হারিয়েছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী মোট ৫৮ হাজার ২২০ জন সদস্য হারিয়েছিল। এখানেও ট্রাম্প ভুল তথ্য বলেছেন।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনাসদস্য নিহত হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘আমাদের জন্য নগণ্য একটি ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন।
শুক্রবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে তিনি কীভাবে বর্ণনা করবেন— এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হন ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালানো সত্ত্বেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার জোর দিয়ে বলেছিলেন এটি কোনো যুদ্ধ নয়; ঠিক তার পরই এ প্রশ্নটি করা হয়।
এবিসি নিউজের র্যাচেল স্কট ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করতে পারেন— যদি এটি যুদ্ধ না হয়, তবে আসলে এটি কী?’
জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, দেখুন, অনেকেই এটাকে যুদ্ধ বলে না। আমি এটাকে সামরিক সংঘাত বলি, কারণ আমাদের কাছে এটি খুবই নগণ্য একটি বিষয়। এটি কোনো বড় ঘটনা নয়। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও আমরা এমনটাই করেছিলাম, আর এখানেও তাই করছি। নিতান্তই ‘সামান্য ব্যাপার/স্মল পটেটোস’— নিজের এই দাবির পক্ষে যুক্তি দিতে তিনি যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যার তুলনা তুলে ধরেন।
চীনের নস্ত্রাদামুস: ২০২৭ সালে ইরানকে ঘিরে শুরু হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, যা ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। গত ৬ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ পরিণতি নিয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ‘চীনের নস্ত্রাদামুস’ খ্যাত জিয়াং শুয়েচিন। চীনা বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুয়েচিন। মার্কিন উপস্থাপক জ্যাক নিলের পডকাস্টে এ মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
জিয়াংয়ের সবচেয়ে আলোচিত পূর্বাভাস ইরানকে ঘিরে। তার ধারণা, ২০২৭ সালে ইরান পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সংঘাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে জড়িয়ে ফেললে ওয়াশিংটনকে স্থলসেনা মোতায়েনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তার আশঙ্কা, এ যুদ্ধ কয়েক বছর নয়, ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাব্য আরেকটি পরিণতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও জাতীয় সামরিক নিয়োগব্যবস্থা বা ‘ড্রাফট’ চালুর কথা বলেছেন তিনি। এমনকি ১৮ বছর বয়সী তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় যোগ দেওয়ার পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বলে তার পূর্বাভাস।
যুদ্ধের অভিঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে।