Image description

‘ভোর ৪টার দিকে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এ সময় পাশের কক্ষের থাই গ্লাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

বারান্দায় গিয়ে দেখতে পাই, চারটি মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা অন্তত আটজনের একটি দল বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। তাদের হাতে ছিল অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।’

ঘটনার বর্ণনা এভাবেই দেন এস এম রেজা চৌধুরী সেলিম। গত শুক্রবার রাজধানীর ডেমরা এলাকার এই বিএনপি নেতার বাড়িতে সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ডেমরা থানার  ওসি মো. তাইফুর রহমান মির্জা কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদক কারবারে বাধা পেয়ে এই সন্ত্রাসীরা তাঁর বাসায় গুলি ছোড়ে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। 

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের রাউজানে মোহাম্মদ আবদুল করিম নামে স্থানীয় এক যুবদলকর্মীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এভাবে গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে দেড় শতাধিক গুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৩৫টি ঘটনায় গুলিতে নিহত হয় ৬১ জন।

পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এসব গুলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, মাদক সেবনসংক্রান্ত বিরোধ, পূর্ব শত্রুতা ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এসব গুলির ঘটনা ঘটছে বলে প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ এ সময় ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, চার হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিন, ৬৫টি ককটেল, সোয়া দুই কেজি গান পাউডার, ৮৯৩টি  দেশীয় অস্ত্র, ৭১টি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ২১টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং ১০ হাজার ৩০০টি চকলেটবাজি উদ্ধার করেছে।

উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল ১৫৩টি, শ্যুটারগান ৪৮টি, এলজি ৪৫টি, রিভলবার ২৬টি, বন্দুক ১০৮টি, পাইপগান ২৬টি, শটগান সাতটি, রাইফেল সাতটি, এসএমজি তিনটি, এয়ারগান ১২টি ও পেনগান

একটি। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলছে গোয়েন্দা নজরদারি।

সম্প্রতি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে এভাবে একের পর এক খুনাখুনি  বেড়েছে। গত রবিবার রাজধানীর গেণ্ডারিয়া স্বামীবাগের মুনশিরটেক জামে মসজিদের গলিতে একদল যুবকের এলোপাতাড়ি গুলিতে স্থানীয় দোকানিসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় বিএনপিকর্মী মনির হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয় ঘিরে এ হামলা চালানো হয়। তখন তাঁর ওই কার্যালয় ভাঙচুর করার পাশাপাশি হামলা চলে আশপাশের কয়েকটি দোকানেও।

আহত সিয়াম বলেন, তিনি থাকেন যাত্রাবাড়ী এলাকায়। সেখানে একটি হোটেলে কাজ করেন। সন্ধ্যায় গেণ্ডারিয়ার মুনশিরটেকে তাঁর ফুপার চায়ের দোকানে এসে হঠাৎ রাস্তায় মারামারির মধ্যে পড়ে যান। তিনি দোকানের ভেতর থেকে শাটার বন্ধ করে দিতেই তাঁর ডান কাঁধে একটি গুলি এসে লাগে। আহত আশা আক্তার বলেন, তিনি ওই এলাকায় থাকেন। সন্ধ্যায় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ডান পায়ে গুলি লাগে। তাঁরা দুজনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের উদৃ্লতি দিয়ে ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনায় সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ করে ফরিদ বেপারী, মো. সবুজ, সাহাদত হোসেন আলিফ ও রিফাত হোসেন নামে চারজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, একটি সুইচ গিয়ার চাকু, একটি ছোরা এবং ১৬০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গত ৭ জুলাই রাতে মিরপুরে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সিজুকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় জামিল হোসেন ওরফে শ্যুটার জাকির নামে একজন ‘পেশাদার সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারী’কে গ্রেপ্তার করে তার কাছ থেকে দুই রাউন্ড গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলিভর্তি একটি কালো রঙের বিদেশি রিভলবার উদ্ধার করা হয়।

ডিবি বলছে, জাকির দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। সে কথিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তানভীর ইসলাম জয়ের সহযোগী হিসেবে মিরপুর এলাকায় কাজ করে  আসছিল।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানী এলাকার একটি বাসায় ‘ডাকাতির প্র্রস্তুতি’ নেয় একদল সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ, হাসপাতাল ও স্থানীয় ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের সাত মাসে রাজধানীতে অন্তত ১৫টি গুলির ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়। আহত ১১ জন। একই সময় সারা দেশে আরো ১১৫টি গুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও খুলনায় ৩১টি গুলির ঘটনা ঘটে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবৈধ অস্ত্র বাড়তে থাকে। এ সময় থানা ও ফাঁড়ি থেকে পুলিশের লুট হওয়া পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ১৩ শতাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর বাইরে সীমান্তের চোরাপথে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ঢোকে দেশে। এসব অস্ত্রে এখন খুনাখুনি বাড়ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রে পুলিশকে গুলি ছুড়ে সন্ত্রাসীরা। 

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে দেশে ২৫০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হয় এবং অন্তত ৮০ জন মারা যায় বলে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে অপরাধিরা অবৈধ অস্ত্রে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহর থেকে গ্রামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাড়ছে। এসব অস্ত্রধারীর বেশির ভাগ কিশোর-তরুণ। এরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে অর্থের বিনিময়ে ‘শ্যুটার’ হিসেবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকের স্পট। এমনকি দিনের বেলায়ও তারা বেপরোয়া। এরা প্রায়ই পথচারীদের অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাদের ভয়ে থানায় অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছে না।

লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আরো জোরদার করতে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে লুট  হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয় হবে।

সম্প্রতি মন্ত্রী রাজধানীর রাজারবাগে ‘বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়াম’-এ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স আয়োজিত ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সম্মেলনে (এপ্রিল-জুন ২০২৬ : দ্বিতীয় কোয়ার্টার) প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা চাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উন্নতি। মাদকের মূল গডফাদার ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পুলিশের লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই—এমন দৃষ্ট্রান্ত স্থাপন করতে হবে।