Image description

হাজার কোটি টাকা অনিয়মে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি-ম্যানেজিং কমিটির জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরেজমিন তদন্ত রিপোর্টের মধ্যে ৯০টিতেই অনিয়মের মূল কারণ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই কমিটি। ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন নামে টাকা লুটপাট করে তহবিল শূন্য করা হয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সংস্কারের কোনো কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনাও কম নয়। ডিআইএর তদন্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

একসময় সমাজের দানশীল ব্যক্তিরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করত, আর তারাই পরিচালনা করতেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তদারকিকরণ, লেখাপড়ার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ধারণা থেকে স্কুলের ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজিং কমিটি’ ও কলেজের ক্ষেত্রে ‘গভর্নিং বডি’ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। অথচ বেশির ভাগ কমিটি স্কুল-কলেজকে নিজের অর্থ আয়ের অন্যতম উত্স হিসেবেই দেখছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ডুবছে এই কমিটির কর্মকাণ্ডের কারণেই। এই দুই কমিটি টাকা আত্মসাত্সহ নানা অনিয়ম করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত প্রায় দুই দশক ধরে একশ্রেণির আমলা ও রাজনীতিকের প্রভাব নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই কমিটিকে।

রাজধানীর মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত ১৬ বছরে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাত্, কর ও ভ্যাট ফাঁকি ও জবাবদিহিহীন ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৭ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। ডিআইএর তদন্ত টিমের একজন সদস্য ইত্তেফাককে বলেন, মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা অনিয়মে সরাসরি জড়িত ঐ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি-গভর্নিং বডি। গত মে মাসে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া রাজধানীর বেইলি রোডে সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নিয়ে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, হিসাব জালিয়াতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

তিন বছর ধরে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছে ৩৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: দেশে প্রায় ৩৯ হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।গত প্রায় তিন বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে নেই নির্বাচিত ম্যানেজিং (ব্যবস্থাপনা) কমিটি ও গভর্নিং বডি। দফায় দফায় অ্যাডহক কমিটি গঠন করে পরিচালনা করা হচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও নির্বাচিত কমিটি দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। বরং অ্যাডহক কমিটিতে বসানো হচ্ছে দলীয় লোকজন। এ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট দেশের সব বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের অপসারণ করা হয়। ঐদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধান ২০২৪-এর ৬৮ অনুযায়ী সভাপতি পদে থাকা সবাইকে অপসারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনাররা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবেন।

এর তিন মাস পর ২০ নভেম্বরে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অ্যাডহক কমিটি কর্তৃক আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিয়মিত কমিটি গঠন করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোকে অনুরোধ করা হলো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনোটিতেই হয়নি নিয়মিত কমিটি। বরং অ্যাডহক কমিটি পুনর্গঠন হয়েছে তিন থেকে চার বার। এখনো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দিচ্ছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। গত ২৫ জুলাই রাজধানীর সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। 

কিন্তু আগের রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তা স্থগিত করা হয়। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং নির্বাচনের নতুন শিডিউল ঘোষণার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক ও গভর্নিং বডির নির্বাচনের প্রার্থীরা। তবে ঐ নির্বাচন আর আলোর মুখ দেখেনি। অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ছয় মাস পর অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাদের নিয়মিত কমিটি গঠনের দিকে যেতেই হবে। ২০২৪ সালের সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে সমন্বিতভাবে একটি প্রবিধানমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির দায়িত্ব ১৬টি: বিধিমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ১৬টি দায়িত্ব পালনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এগুলোরে মধ্যে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ডোনেশন সংগ্রহ, কর্মচারী নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণের সুপারিশ, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন ও উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের বিনা বেতনে অধ্যয়ন মঞ্জুরি, ছুটির তালিকা অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান ও স্টাফদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, জমি, ভবন, খেলার মাঠ, বই, ল্যাবরেটরি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্কুলের সম্পত্তির কাস্টডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের নিয়ে প্রি-সেশন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা।

সরকারই তো সবই দিচ্ছে, কমিটি করছে কী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, শুধু বেতন-ভাতাই নয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের খরচই বহন করে সরকার। শিক্ষার্থীদের বই থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চসহ সব আসবাবপত্র, বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ, নতুন ভবন তৈরি, ভবন সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের খরচ সবই বহন করে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের বড় অংশটিই ব্যয় হয় এসব খাতে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অযাচিত খবরদারির দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের। সরকারি অর্থে প্রতিষ্ঠানের সবকিছু চললেও সরকারের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। যখন সরকার পুরো বেতন-ভাতা দিত না, তখন শিক্ষকদের বেতনের টাকা সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য কমিটির দরকার ছিল। চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কিনে দিতে হতো। তবে এখন আর এ কাজ পরিচালনা পর্ষদের করতে হয় না।

অনুমোদিত খাতের বাইরে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে স্কুল-কলেজের ফান্ড লুটপাট করা হচ্ছে: অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, অ্যাডহক কমিটির প্রথম কাজই হলো নির্বাচনের মাধ্যমে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি গঠন করা। কিন্তু এসব অ্যাডহক কমিটি নির্বাচন করার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং দফায় দফায় অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত কমিটি না থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, সঠিকভাবে মনিটরিংয়ের অভাবে শিক্ষার মানের ক্রমেই অবনতি ঘটছে এবং এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকার অনুমোদিত খাতের বাইরে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে স্কুল-কলেজের ফান্ড লুটপাট করা হচ্ছে। তিনি দ্রুত এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত কমিটি গঠনের দাবি জানান।