Image description

ভোটেকোশির ভয়াল স্রোত কেড়ে নিয়েছে তার ঘর, জমি, বছরের পর বছরের পরিশ্রম। নিখোঁজ বাবা, খোঁজ নেই আরও ১৫ জন আত্মীয়ের। নিজের জীবনই যেখানে অনিশ্চয়তায় ভরা, সেখানে অন্যদের কথা ভাবার সময় কোথায়? কিন্তু নেপালের রসুয়ার বাসিন্দা বিক্রম থাপা মাগারের কাছে নিজের শোকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।

বন্যায় সব হারিয়েও তিনি কাঠমান্ডু ছুটে গিয়েছেন নিজের জন্য নয়, দুর্গত গ্রামবাসীর জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করতে। চোখে এখনও নিখোঁজ বাবার অপেক্ষা, মনে নিজের ভেঙে যাওয়া সংসারের কষ্ট। তবু তাঁর কণ্ঠে একটাই আবেদন, বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে হবে।

গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে নেপালের রাশুয়া জেলা। ভোতে কোশি নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যায় বহু ঘরবাড়ি, জমি ও সম্পদ। বিক্রমেরও রক্ষা হয়নি। তার বাবা ও ১৫ জন আত্মীয় বন্যার পর থেকে নিখোঁজ। তারা কোথায়, বেঁচে আছেন কি না, কিছুই জানেন না তিনি।

বিক্রমের চোখের সামনে এখনও ভাসে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত। বন্যার সতর্কবার্তার পর হাতে ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু ভোটেকোশির স্রোত ছিল এত দ্রুত ও শক্তিশালী যে পালানোর সুযোগ পাননি অনেকেই। কেউ সন্তানকে বাঁচাতে ছুটেছেন, কেউ বৃদ্ধ স্বজনকে নিরাপদে সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নদীর উন্মত্ত গতির কাছে হার মানতে হয়েছে সবাইকে।

এই বিপর্যয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে বিক্রমের মেয়েও। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন শিশুকে নিয়ে যাওয়া একটি স্কুলবাস বন্যার কবলে পড়ে। চালক শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বাসটি স্রোতে ভেসে যায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় বিক্রমের মেয়ে। কিন্তু তার বাবা ও ১৫ আত্মীয় এখনও নিখোঁজ।

বন্যার পর রাসুয়ার উত্তারগয়া গ্রামীণ পৌরসভার ১, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রম। বহু মানুষের ঘর নেই, জমি নেই, খাবার নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা একে অপরকে আশ্রয়, পানি ও খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই সহযোগিতা আর কত দিন চলবে, সেই প্রশ্নই তাকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে এসেছে।

বিক্রম নেপাল ফেডারেশন অব ইন্ডিজেনাস ন্যাশনালিটিজের রাশুয়া শাখার সভাপতিও। তার অভিযোগ, আকাশে হেলিকপ্টার দেখা গেলেও দুর্গত গ্রামের মানুষ এখনও রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করছে না। ধ্বংসস্তূপের পাশে ক্ষুধার্ত শিশু, নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবার... এই যন্ত্রণা দূর থেকে দেখা যায় না।

ভোটেকোশির জল একদিন থেমে যাবে। কিন্তু বিক্রমের অপেক্ষা থামবে না। হয়তো কোনও একদিন ফোন আসবে, “আপনার স্বজনদের খুঁজে পাওয়া গেছে।”সেই ফোনই এখন তাঁর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশা। ততদিন নিজের কষ্ট বুকে নিয়েই গ্রামের মানুষের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন তিনি।