Image description

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উন্মোচন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।

 

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পরও প্রতিবেশীরা তথ্য দিতে কিছুটা লুকোচুরি করছিল। তবে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে এবং দ্রুততম সময়ে হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন আর লুকোচুরি বা ধোঁয়াশার কিছু নেই।’ 

বিনোদনসংবাদ

 

তিনি বলেন, ‘লাশ উদ্ধার অভিযান চলাকালেই গোপন সূত্রের মাধ্যমে দুই সন্দেহভাজনের নাম জানতে পারে পুলিশ। উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করে। কোনো বিলম্ব ছাড়া পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আলামত সংগ্রহ করায় এবং অন্যান্য বিভাগের সহায়তায় কাজ করায় তদন্তের কোনো আলামত নষ্ট হয়নি।’

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের দুই দিন ধরে ফোনে না পেয়ে গত ২২ আগস্ট রাতে স্বজনরা বাড়িতে যান। বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ আসছিল। অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে রাত সাড়ে ১০টায় তারা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে গণপতি চক্রবর্তীর লাশ ছাদে, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ ছাদে ওঠার সিঁড়িতে এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ শোবার ঘরে খাটের নিচে পাওয়া যায়।’

ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, ‘লাশ উদ্ধারের অভিযান চলাকালীন ঘটনাস্থলের আশপাশেই ঘোরাফেরা করছিল সিদ্ধার্থ দাস। বিষয়টি টের পেয়ে তার বাবা বিনয় দাস তাকে পাশের কাকার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রাত ৩টার কিছু পরে আমরা বিনয় দাসের কাছে গিয়ে সিদ্ধার্থের অবস্থান জানতে চাই। বাবার ডাকে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে এলে তাকে সঙ্গে নিয়ে অপর আসামির সন্ধানে অভিযানে নামি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সিদ্ধার্থকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধের বাড়িতে যাওয়া হলেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, মুগ্ধ পালিয়ে দখিগঞ্জ শ্মশানে আশ্রয় নিয়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই ডিবি পুলিশের দলটি সেখানে পৌঁছায় এবং শ্মশানের কেয়ারটেকারের ঘরের সামনে বসে থাকা অবস্থায় মুগ্ধকে আটক করে কার্যালয়ে নিয়ে আসে।’

দখিগঞ্জ শ্মশানে সরেজমিনে দেখা যায়, ভেতরে ঢোকার মুখে বাম পাশে এবং পেছনের দিকে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগান। নিচু ইটের সীমানা প্রাচীরের ওপর স্টিলের বেড়া থাকায় তুঁতবাগান থেকে শ্মশানের ভেতরে সহজেই প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

সেদিন অভিযানের মুহূর্ত বর্ণনা করে শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ মোহন্ত বলেন, “ওইদিন সে তুঁতফার্ম থেকে এসে দরজায় কড়া নেড়ে  পানি চায়। আমি গেট না খুলে প্রথমে জানালা খুলি। এরপরই দেখি প্রশাসন চলে এসেছে এবং পরে তাকে নিয়ে যায়। যখন প্রশাসন ওকে নিয়ে যায়, তখন আমি দরজা পর্যন্ত গিয়ে বলি ‘তোর তো ফাঁসি হওয়া উচিত’।”

 

প্রথম দিনে রেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ

 

হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী, উপপরিদর্শক মমিনুল ইসলাম ও আবু সাঈদ বাবলা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

এর আগে আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। তবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান, আসামিপক্ষে লিগ্যাল এইডের আইনজীবীদের ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকা এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে গত সোমবার বিকালে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম আসামিদের দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।

 

মামলার চার্জশিট দ্রুত দেওয়া হবে

 

মঙ্গলবার বিকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ জানান, গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘কোনো বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না। পেশাদারিত্বের সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’

গত ২৩ আগস্ট ভোরে রংপুর নগরীর মাছোয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়।