আজ (১ সেপ্টেম্বর) মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি (এম এ জি) ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১৮ সালের এই দিনে তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ মহকুমায় জন্ম নেন বাঙালির এই সামরিক নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে একটি সদ্যোজাত দেশের বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার পেছনে যার নেতৃত্ব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী বা বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী। সৈনিকজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, কৌশলী নেতৃত্ব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
বঙ্গবীর নামে পরিচিত এম এ জি ওসমানীর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বালাগঞ্জের দয়ামীর গ্রামে। তার বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মা জোবেদা খাতুন। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশবের একটি সময় কেটেছে গুয়াহাটিতে। পরে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রাইওটোরিয়া পুরস্কারে সম্মানিত করে। এরপর ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
কেন তাকে ‘বঙ্গবীর’ বলা হয়?
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সামরিক নেতৃত্ব ও বীরত্বের জন্য জেনারেল এম এ জি ওসমানী বাঙালির কাছে বঙ্গবীর নামে পরিচিতি পান। ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো সুসংগঠিত হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ পরিচালিত হয়। তার এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণেই বঙ্গবীর নামটি তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
সামরিক জীবনে হাতেখড়ি
শিক্ষাজীবন শেষ করে ওসমানীর জীবনের মোড় ঘুরে যায় সামরিক পেশায়। ১৯৩৯ সালে তিনি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দেরাদুনের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে কমিশন লাভের পর দ্রুত পদোন্নতি পেতে থাকেন। ১৯৪১ সালে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৪২ সালে মেজর হন। অল্প বয়সেই ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব পাওয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা রণাঙ্গনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
ভারত ভাগের পর ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরের বছর কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি জেনারেল স্টাফ ও সামরিক অপারেশনসের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে সেনা সদর দপ্তরে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ও সামরিক অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।
বাঙালি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাতন্ত্র্য
সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অবস্থাতেই বাঙালি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে আছে। অবসরের পর সামরিক জীবনের বাইরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি।
সামরিক পোশাক ছেড়ে রাজনীতির মাঠে
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা এবং ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হওয়া গণহত্যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দেয়। শুরু হয় মুক্তির সশস্ত্র সংগ্রাম।
মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ওসমানী সামরিক প্রতিরোধকে সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে তাকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় সামরিক নেতৃত্ব দেওয়া হয়। পরে মুজিবনগর সরকার গঠনের পর তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
মুক্তিযুদ্ধে সামরিক নেতৃত্ব
তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়। জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলনের পর যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং গেরিলা যুদ্ধের বিস্তারে ওসমানীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কৌশলেও তিনি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনেন। সীমিতসংখ্যক নিয়মিত সৈন্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে শুধু প্রতিরোধের বদলে গেরিলা ও গণবাহিনীর মাধ্যমে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা ও অবস্থানকে দুর্বল করার ওপর জোর দেন।
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে নৌ-কমান্ডো ও ক্ষুদ্র আকারের বিমান সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়। এর ফলে স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি নদীপথ ও আকাশপথে সীমিত আকারে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে।
স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক নেতৃত্ব
স্বাধীনতার পর ২৬ ডিসেম্বর ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ১৯৭২ সালের এপ্রিলে জেনারেল পদ বিলুপ্ত হলে তিনি সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তাকে নৌপরিবহন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বিমান চলাচল-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ
১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও নির্বাচিত হন এবং নতুন মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পান। তবে ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদ সদস্য পদ ও আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ ত্যাগ করেন।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান ওসমানী। তবে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনার পর তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি জাতীয় জনতা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের সভাপতি হন।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। ১৯৭৮ সালে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে এবং ১৯৮১ সালে জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
লন্ডনে মৃত্যু, সিলেটে সমাহিত
ব্যক্তিজীবনে আজীবন অবিবাহিত ছিলেন ওসমানী। জীবনের শেষদিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে তার অবদান স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। সিলেটে তার নামে রয়েছে এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী জাদুঘর। ঢাকায় রয়েছে ওসমানী উদ্যান ও ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন। এসব স্থাপনা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে তার নাম ও অবদানের স্মারক হয়ে আছে।
সিপাহসালার থেকে ‘বঙ্গবীর’
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দক্ষ কর্মকর্তা, এরপর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক—জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জীবন তাই কেবল একজন সেনানায়কের জীবনী নয়; এটি বাঙালির রাষ্ট্রচেতনা, সামরিক নেতৃত্ব ও মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।