Image description
সৌন্দর্যের নামে বিষাক্ত কারবার । শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে অ্যাজমার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে -ডা. শামীম আহমেদ । কৃত্রিম রাসায়নিকের স্প্রেতে বদলে যাচ্ছে ফুলের রঙ ও ঘ্রান।

প্রাকৃতিক ফুলেও ভেজালের থাবা। মরা ও বিবর্ণ ফুল সংগ্রহ করে হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হওয়া কৃত্রিম রং স্প্রে করে বদলে দেওয়া হচ্ছে স্বাভাবিক রঙ। ঘ্রাণহীন ফুলে ছিটানো হচ্ছে কৃত্রিম সুগন্ধি। এরপর চোখ ধাঁধানো রং ও তীব্র ঘ্রাণে আকৃষ্ট করে এসব ফুলই তুলে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার হাতে চড়া দামে। রাজধানীর শাহবাগ ও জিয়া উদ্যানের আশপাশে তদারকি সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনেই প্রকাশ্যেই চলছে ফুলের এমন রাসায়নিক কারসাজি। তবুও এক প্রকার নিশ্চুপ মাঠ প্রশাসন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেছেন, হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের স্প্রে রং ফুলে ছিটানো হলে তা মানবদেহের বিভিন্ন ক্ষতি করতে পারে। এই রঙে টলুইন, জাইলিন, অ্যাসিটোন, ইথাইল অ্যাসিটেটসহ নানা ধরনের দ্রাবক ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। এসব রং স্প্রে করার সময় তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম কণা ও রাসায়নিক বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে চোখ, নাক, গলা ও শ্বাসনালিতে জ্বালা, কাশি, মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় বা উচ্চমাত্রায় সংস্পর্শে থাকলে কিছু রাসায়নিক স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ ধরনের কোটিংয়ে থাকা আইসোসায়ানেট শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে অ্যাজমার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৭টা। রাজধানীর শাহবাগের ফুলের পাইকারি আড়তে তখন জমজমাট বেচাকেনা। রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি দরে শ হিসাবে কিনে নিচ্ছেন নানা জাতের ফুল। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে ব্যস্ত পুরো এলাকা। এই ব্যস্ততার আড়ালেই সক্রিয় দেখা যায় একটি অসাধু চক্রকে। সরেজমিন দেখা যায়, পাইকারদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা ফুল কেনার সময় ঝুড়ি বা স্তূপ থেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে মরা, বিবর্ণ ও তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় ফুল। অন্যরা যখন বেচাকেনায় ব্যস্ত, তখনই সেসব ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছে চক্রের সদস্যরা। সাধারণ ফুলের চেয়ে সাদা ও গোলাপি এবং গ্লাডিওলাস সংগ্রহেই তাদের আগ্রহ বেশি। কখনো আবার পাইকারদের ব্যস্ততার সুযোগে ঝুড়ি থেকেও ফুল সরিয়ে নিতে দেখা যায় তাদের। ভোর থেকে সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ফুল সংগ্রহের তৎপরতা।

সকাল ১০টার দিকে পাইকারি বাজারের বেচাকেনা যখন কিছুটা কমে আসে, তখন কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে ওই ব্যক্তিদের শাহবাগ থানার পাশ ঘেঁষা টিন দিয়ে ঘেরা একটি স্থানের দিকে যেতে দেখা যায়। সেখানেই শুরু হয় ফুলের রং বদলের কারসাজি। সরেজমিন আরও দেখা যায়, সাদা গোলাপে কৃত্রিম রঙের স্প্রে করে তৈরি করা হচ্ছে টকটকে লাল গোলাপ। গোলাপি ফুলেও স্প্রে করে দেওয়া হচ্ছে লাল ও নীল রং। কালো রঙের স্প্রে ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে নজরকাড়া কালো গোলাপ। শুধু রং বদলেই থেমে নেই কারসাজি। ঘ্রাণহীন ও ম্লান ফুলে ছিটানো হচ্ছে কৃত্রিম সুগন্ধি। অল্প সময়ের ব্যবধানেই বিবর্ণ ফুল হয়ে উঠছে চকচকে ও আকর্ষণীয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম। এরপর রঙিন ও সুগন্ধি ছড়ানো ফুল নিয়ে চক্রের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়েন শাহবাগ, রমনা পার্ক ও আশপাশের এলাকায়। টার্গেট করা হয় ঘুরতে আসা তরুণ-তরুণী ও সাধারণ ক্রেতাদের।

দুপুর সাড়ে ১২টা। টিএসসি মোড়ে ঘুরতে আসা এক যুগলের কাছে ফুল নিয়ে হাজির হন এক ফুল বিক্রেতা। বিক্রেতার হাতে থাকা কালো গোলাপ দেখে আগ্রহী হন তারা। দাম জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, জোড়া ৭০০ টাকা। পরে দরদাম করে ৬০০ টাকায় দুটি গোলাপ কিনে নেন ক্রেতা। চোখ ধাঁধানো কালো রং আর তীব্র ঘ্রাণ স্বাভাবিক ফুলের চেয়ে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করায় ফুলের জোড়া চড়া দামে কিনে নেন ক্রেতা।

মঙ্গলবার বিকালে একই চিত্র দেখা যায় জিয়া উদ্যানের আশপাশেও। উদ্যানের প্রধান সড়কের সামনেই প্রকাশ্যে মরা ও বিবর্ণ ফুলে কৃত্রিম রং স্প্রে করতে দেখা যায়। পাশেই ঘ্রাণহীন ফুলে ছিটানো হচ্ছে কৃত্রিম সুগন্ধি। পথচারী, ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই চলে এসব কর্মকাণ্ড। আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চলাচল থাকলেও প্রকাশ্যে চলা এ কার্যক্রম বন্ধে কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। জিয়া উদ্যানের সামনে ফুল কেনার সময় সানজিদা যুগান্তরকে বলেন, টকটকে লাল দেখে চারটি গোলাপ কিনেছি। প্রতি পিস ৬০ টাকা করে নিয়েছে। বিক্রেতা বলেছে, অন্য ফুলের তুলনায় এগুলো বেশি তরতাজা এবং ঘ্রাণও বেশি। কিন্তু কেনার পর নাকে ঘ্রাণ নিতে গিয়ে ঝাঁজালো লাগছে। স্বাভাবিক ফুলের মতো মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, ঘ্রাণটা নাকে নেওয়ার পর সরাসরি মাথায় আঘাত করছে। তার ভাষ্য, এটা আসলেই প্রাকৃতিক ফুল কিনা, এখন সন্দেহ হচ্ছে। প্রাকৃতিক ফুলে এমন অস্বাভাবিক রং আর ঝাঁজালো ঘ্রাণ থাকার কথা নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সব কিছু পার করে অসাধুরা এখন প্রাকৃতিক ফুলেও ভেজাল দেওয়া শুরু করেছে। ক্রেতাদের কাছে এই রাসায়নিক মিশ্রিত ফুল বেশি টাকায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। অন্যদিকে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই তদারকি সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বিষয়ে কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করে অসাধুদের আইনের আওতায় আনা উচিত।