পাসপোর্ট করতে জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গেলেই যেন শুরু হয় ভোগান্তি। অফিসের সামনে রিকশা বা অটো থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই সেবাপ্রার্থীদের ঘিরে ধরেন দালালরা। পাসপোর্ট করতে এসেছেন কি না, জরুরি পাসপোর্ট করবেন কি না, এমন নানা প্রশ্নের পর নিজেদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে কাজ না করালে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বিভিন্ন ভুল ধরে আবেদনকারীকে হয়রানি করা হয়। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে নানা অজুহাতে আবেদন ফেরত দেওয়ার অভিযোগ সেবা প্রার্থীদের।
জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ সরেজমিনে অনুসন্ধান করেছে ডেইলি ক্যাম্পাস। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রতিবেদক নিজেই গ্রাহক সেজে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফাইল হাতে নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যান।
গেটেই দালালের প্রস্তাব
অফিসের সামনে রিকশা থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন প্রতিবেদককে ঘিরে ধরেন। পাসপোর্ট করতে এসেছেন কি না জানতে চান তারা। জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট করার কথা জানালে নিজেদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
অনুসন্ধানে এক দালাল প্রতিবেদককে জানান, ১০ বছর মেয়াদি ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ১০ দিনের মধ্যে করতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫০ টাকা জমা দিতে হয়। তবে তাদের মাধ্যমে কাজ করাতে হলে দিতে হবে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকারি ফির বাইরে প্রায় আড়াই হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার কথা জানান ওই দালাল। তার দাবি, অতিরিক্ত নেওয়া টাকার একটি অংশ তথ্য দিতে হয় অফিস কর্তাকে। আর বাকি টাকা পাসপোর্টের আবেদনপত্রের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দিতে হয়।
দালাল আরও জানান, তাদের মাধ্যমে কাজ না করালে কাগজপত্রে কোনো সমস্যা না থাকলেও বিভিন্ন ভুল বের করে আবেদনকারীকে হয়রানি করা হয়। কাগজপত্রের নানা বিষয় যাচাই করে কোনো না কোনো ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
গেটে আনসার সদস্যের সহযোগিতার প্রস্তাব
এরপর প্রতিবেদক পাসপোর্ট অফিসের গেটের দিকে গেলে সেখানে আনসার সদস্যদের বাধার মুখে পড়েন। পরিচয় গোপন রেখে পাসপোর্ট করার কথা জানালে আনসার সদস্য আকাশ তাকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
এ সময় ওই আনসার সদস্য প্রতিবেদককে বলেন, তার সহযোগিতা ছাড়া ভেতরে গিয়ে পাসপোর্টের কাজ করা কঠিন হবে। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বিভিন্ন ভুল ধরে ফেরত দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
পরে তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক অফিসের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ফাইলে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার
অফিসের ভেতরে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করানো সেবাপ্রার্থীদের কিছু কাগজপত্রে বিশেষ ধরনের চিহ্ন দেখা যায়। তবে দালাল অনুযায়ী ভিন্নভিন্ন চিহ্ন দেয়া থাকে এসব কাগজপত্রে।
ওই সেবাপ্রার্থীর কাগজপত্র জমা দেওয়ার সময় বিশেষ চিহ্নটি প্রতিবেদকের নজরে আসে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই চিহ্নের ছবি ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, এ ধরনের বিশেষ চিহ্ন থাকলে কাগজপত্র সহজেই গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে দালালের মাধ্যমে না এলে বা কাগজে বিশেষ সেই চিহ্ন না থাকলে কাগজপত্রে বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়া হয়।
কম্পিউটারের দোকানেও দালাল
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, পাসপোর্ট করতে আসা অনেক সেবাপ্রার্থীই কোনো না কোনো দালাল বা বাইরের কম্পিউটার দোকানের মাধ্যমে কাজ করছেন। কেউ অফিসের বাইরেই দালালের সঙ্গে দরদাম করছেন, আবার কেউ গেট থেকে দালালের সহযোগিতা নিচ্ছেন।
সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাসপোর্টের নিয়মকানুন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই দালালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি ফির বাইরে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
‘স্পেশাল স্বাক্ষর’
ইসলামপুরের দেলিপাড় এলাকা থেকে পাসপোর্ট করতে আসা ভুক্তভোগী জুবায়ের আহম্মেদ বলেন, আমি গত সপ্তাহে পাসপোর্টের প্রয়োজনীয় সব কাগজ জমা দিয়ে বায়োমেট্রিক দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাউন্টারে তা জমা নেয়নি।
তারা বলেন, ডকুমেন্ট ঠিক নেই। পরে বাইরে ফটোকপির দোকানে যেতেই দোকানদার বলল, আমাকে ২ হাজার টাকা দেন, কিছুই লাগবে না। আমি করে দিচ্ছি। সেখানে আমি ১ হাজার ৫০০ টাকায় রাজি হলে আমার কাগজে কী একটা স্পেশাল সাইন দিয়ে দেয়। সেটা দেখে জমা কাউন্টার আর কিছুই না দেখে আমার ফাইল নিয়ে আমার বায়োমেট্রিক নেয়। এখানে সবারই একই চিত্র। সবারই স্পেশাল সাইন লাগে, না হলে জমা হয় না।
মেলান্দহ থেকে পাসপোর্ট করতে আসা আরেক ভুক্তভোগী মারুফ ইসলাম বলেন, জামালপুর পাসপোর্ট অফিসে ১০৪ নম্বর রুমে কাগজপত্র জমা দিতে হয়। দালাল ছাড়া আবেদন জমা দিতে গেলে একটার পর একটা কাগজ চেয়ে আবেদনকারীকে হয়রানি করা হয়। অথচ বাইরের কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা দালালি খরচ দিলেই কোনো ডকুমেন্ট ছাড়াই আবেদন জমা হয়ে যায়। সবই পীর-দরবেশের খেলা।
দালাল-অফিসের যোগসাজশ
সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্য ও অনুসন্ধানে দালালদের প্রকাশ্যে সেবাপ্রার্থীদের টার্গেট করা, সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং দালালের মাধ্যমে আসা আবেদনকারীদের কাজ সহজ করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিশেষ করে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার বিষয়ে দালালের দেওয়া বক্তব্য এবং আবেদনপত্রে বিশেষ চিহ্ন বা স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থের সঙ্গে অফিসের ভেতরের কারও কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না?
এ বিষয়ে জামালপুর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জামালপুর পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে এর আগেও আমরা প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেছি। সেসময় তিনজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর কিছুদিন পরিস্থিতি ভালো থাকলেও আবারও অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়। পরে আমরা আবারও মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছি। কিছুদিন দুর্নীতি বন্ধ থাকার পর আবারও তা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সভায় আমরা বিষয়টি তুলে ধরছি। এবারও যদি কার্যকরভাবে এর সমাধান না হয়, তাহলে বৃহৎ পরিসরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এ বিষয়ে জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক রিয়াদ হাসান আবির বলেন, আমি আপনাদের মাধ্যমেই বিষয়টি জানতে পারলাম। আমার এখানে পাসপোর্ট নিয়ে কোনো ধরনের হয়রানির সুযোগ নেই। তারপরও যদি কেউ সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি করে থাকে, তাহলে আমার পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ঘটনা প্রমাণ হলে তার খবর আছে। এ ধরনের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।