বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপা এবারও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দরপত্রে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা করে দর বাড়ানো, একাধিক লটে একক দরদাতা, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৮-৯ শতাংশ বেশি দর, পুনঃ দরপত্র এবং নির্ধারিত মানের পরিবর্তে রিসাইকেল কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে। একই সঙ্গে অনেক লটের দরপত্র চূড়ান্ত হলেও এখনো মুদ্রণ শুরু হয়নি।
ফলে একদিকে বাড়তি দরে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা, অন্যদিকে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো এবং বইয়ের মান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯টি বই ছাপাবে সরকার। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় বছরের শুরুতে বই সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এবারও যদি শেষ মুহূর্তে মুদ্রণের চাপ তৈরি হয়, তাহলে মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বইয়ের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে কাগজের দাম না বাড়লেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের চেয়ে প্রতি ফর্মা (১৬ পৃষ্ঠা) বই ছাপানোর দর এবার ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। দরপত্রের শর্ত ছিল- পাঠ্যবই ছাপাতে শতভাগ ভার্জিন পাল্প কাগজ কিনতে হবে। পাশাপাশি আরও কিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের টেন্ডার অনুযায়ী, প্রতি টন কাগজের দাম ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা হলেও ছাপাখানাগুলো স্থানীয় বাজার থেকে ৮০-৯০ হাজার টাকা দরে প্রায় ৪৫ হাজার টন রিসাইকেল (ব্যবহৃত কাগজের মন্ড থেকে তৈরি) কাগজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাগজের বৈধতা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এটা হলে এবারও শিক্ষার্থীদের হাতে মানহীন বই উঠতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এ বছরও পাঠ্যপুস্তক ছাপায় পুরোনো সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। এনসিটিবি সূত্র জানায়, কিছু লটে মাত্র একজন করে দরদাতা অংশ নিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৮-৯ শতাংশ বেশি দর দিয়েছে। বেশি দর ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে এসব লটে পুনরায় টেন্ডারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ কোটি বই রি-টেন্ডার করতে হতে পারে। এতে মুদ্রণ কার্যক্রম পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শেষ মুহূর্তে ছাপার কারণে কাগজের মান, কালি, ছাপা ও বাঁধাইয়ের মান যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হওয়া স্পোর্টস, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আনন্দময় শিক্ষা ও আমার কারিগরি শিক্ষা- বই চারটি মুদ্রণে এখনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এসব ব্যাপারে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতি বছর সবকিছুর দাম বাড়ছে। কাগজের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে নিয়ম মেনেই দর কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। কী পরিমাণ বই রি-টেন্ডার করতে হবে তা পারচেজ কমিটি থেকে না আসা পর্যন্ত বলা যাবে না। কারিকুলামে যুক্ত হওয়া নতুন চারটি বই মুদ্রণে শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। আশা করছি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপা হয়ে যাবে। ৩০ নভেম্বর ছাপা শেষ হলে এত কম সময়ে বই যাচাই কীভাবে করবেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের বড় ইন্সপেকশন টিম কাজ করবে।
কাজের মান ঠিক না রাখলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বৈরাচার হাসিনার আমলে প্রায় প্রতি বছরই পাঠ্যবই নিয়ে কারসাজি, অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরও ত্রুটিপূর্ণ বই পায় শিক্ষার্থীরা। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৮টি ছাপাখানার বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর অভিযোগ উঠে আসে ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে। আবার ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানকে ম্যানেজ করে নিম্নমানের অনেক বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এজন্য এবার শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ছাপাখানার মালিক, পেপার মিল মালিক ও এনসিটিবির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে কাগজ ও মুদ্রণে শতভাগ মান নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এবারও ৮০ লাখ টনের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টন মানহীন কাগজ কেনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
এদিকে প্রেস মালিকদের একাংশের অভিযোগ, প্রতি বছরই কিছু লটের রি-টেন্ডারের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। আগের দরদাতাকে কেন বাদ দেওয়া হলো এবং পুনঃ দরপত্রে সরকারের ব্যয় বাড়ল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা দরকার।