Image description

হিমাগারে ভাড়া দিয়ে আলু রাখার পর বছরের এই সময়ে এসে আলুর দাম কমে যাওয়ায় এমনিতেই বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তার ওপর লোডশেডিংয়ের কারণে আলু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অসময়ে গেজ হয়ে বীজ আলুসহ খাবার আলু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এতে লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হচ্ছে। দেশের তিন জেলার হিমাগার পরিস্থিতি নিয়ে কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

মুন্সীগঞ্জ : অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু অসময়ে অঙ্কুরোদগম হওয়ায় দাম কমে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। আবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি ভেজা আলু হিমাগারে রাখার কারণে এখন বাছাই করে বাজারজাত করতে গিয়ে বস্তাপ্রতি পাঁচ থেকে সাত কেজি পচা বের হচ্ছে। এতে কৃষকদের ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তবে হিমাগার কর্তৃপক্ষ বলছে, লোডশেডিং বাড়লেও আলু পচবে না, শুধু অসময়ে অঙ্কুরোদগম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মুন্সীগঞ্জে মোট ৬৪টি হিমাগারের মধ্যে বর্তমানে সচল ৬১টি। এসব হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। এবার চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে হিমাগারগুলোতে।

এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও অতিরিক্ত আলু এখানকার হিমাগারগুলোতে রাখা হয়েছে।

পাইকারি আলু ব্যবসায়ী অলি মুন্সী জানান, ‘বস্তাপ্রতি সাড়ে ৬০০ টাকায় কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনে বিভিন্ন জেলায় পাঠাই। কিন্তু দাম কম থাকায় বস্তাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘হিমাগারে আলুর বস্তা রাখতে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। কেজিতে ২২ থেকে ২৩ টাকা খরচ করে আলু রেখেও আমার মতো কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখন কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছি, কারণ দাম আরো কমতে পারে।

তিনি আরো বলেন, হিমাগারে আলু রেখে প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কিন্তু সরকার উৎপাদিত আলু রপ্তানি করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। 

রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার রেজাউল করীম বলেন, অব্যাহত লোডশেডিং হলে আলুতে অসময়ে গেজ হয়ে যাবে। এতে বীজ আলুসহ খাবার আলু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লোডশেডিং না থাকলে কৃষক ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

রাজশাহী : ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত সংরক্ষণের কারণে রাজশাহীর হিমাগারগুলোয় আলুতে পচন ধরেছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, অতিরিক্ত অর্থের লোভে বেশি আলু সংরক্ষণ করা হলেও সেই ধরনের পরিচর্যা করা হয়নি।

রাজশাহীর ৩৯টি হিমাগারের সবটিতেই আলু কম-বেশি পচন ধরেছে। প্রতি বস্তাতেই ৫-১০ কেজি বা তার চেয়েও কখনো কখনো বেশি পচা আলু পাওয়া যাচ্ছে। এমনিতেই খরচের চেয়ে বাজার মূল্য কম, তার ওপর আলু পচার কারণে আরো বাড়তি লোকসানের মুখে পড়েছেন অন্তত ২০ হাজার ব্যবসায়ী। তবে রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, ‘অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে এবার আলুতে কিছু কিছু স্টোরে পচন হয়েছে বলে খবর পাচ্ছি। তবে সব স্টোরেই আলু পচতেছে— এমন নয়।’

জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, ‘প্রতি হিমাগারে আলু পচতেছে। এর অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা। সংরক্ষণের পরে আলুর বস্তার ছয়বার জায়গা পরিবর্তন করতে হয়। একবার জায়গা পরিবর্তন করতে প্রতিটি স্টোরের কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। ফলে স্টোর কর্তৃপক্ষ এক থেকে দুইবার পর্যন্ত এই পরিবর্তন কম করেছে। এতে তাদের ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা সাশ্রয় হলেও আলুতে সঠিকভাবে ঠাণ্ডা বাতাস পায়নি।’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, প্রতি তিন লাইন পর পর তিন ফিট করে ফাঁকা রাখার কথা। কিন্তু সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ লাইন পর পর তিন ফিট ফাঁকা রাখা হয়েছে অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের কারণে। এ ছাড়া সাত ফিট ওপরে অন্তত দুই থেকে তিন হাত ফাঁকা রাখার কথা। যেন ঠিকমতো বাতাস চলাচল করতে পারে। সেখানেও সামান্য পরিমাণে ফাঁকা রাখা হয়েছে। এসব কারণে প্রতিটি স্টোরেই আলুতে পচন ধরেছে।

রংপুর : সংরক্ষণের ভাড়া কমানো এবং হিমাগার মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবিতে রংপুরে বিক্ষোভ করেছেন আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা। গত কয়েক দিনে মহাসড়কে আলু ঢেলে বিক্ষোভ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও, সাদা কাফন পরে অনশন কর্মসূচির পর সর্বশেষ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে আলুর দাম কম। এর মধ্যে হিমাগারে সংরক্ষণ ভাড়া বেশি হওয়ায় তাঁদের লোকসান আরো বাড়ছে।

আলু চাষিদের অভিযোগ, বর্তমানে হিমাগারগুলোতে কেজিপ্রতি প্রায় ছয় টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ভাড়া কমিয়ে পাঁচ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। আলু চাষি নাজমুল ইসলাম বলেন, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ১৬ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম ১৫ থেকে ১৬ টাকা। ফলে সংরক্ষণ ভাড়া বেশি হলে কৃষকের লোকসান আরো বাড়বে।  জেলা আলু চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের গঠিত সুপারিশ কমিটি হিমাগারে আলু সংরক্ষণের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে যে সুপারিশ করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময় এরই মধ্যে চলে যাচ্ছে। এখন আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার সুযোগ নেই।’

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এন এম আলমগীর বাদশা বলেন, কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বা সম্মতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।

রংপুর চেম্বারের পরিচালক শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ভাড়া নির্ধারণে সরকার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, হিমাগার মালিক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্রক্রিয়া থাকা উচিত। তাঁদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতেই যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা প্রয়োজন।