ছয় বছর হয়ে গেল আব্বুর দুনিয়ার সফর শেষ করার। ছবিটা আব্বুর কবরের। কোনো নামফলক নেই। পাশের লাল ইটের ভেঙে যাওয়া দেয়ালটার পাশেই আব্বুর চিরস্থায়ী আবাস।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে থাকার সময় অবসর সময়ে আব্বু একটি বই লিখেছিলেন। একদিন আমাকে বলেছিলেন, বইটির ড্রাফটগুলো টাইপ করে দিতে। তখন আমি বুয়েটের হলে থাকতাম। আব্বুর হাতে লেখা খাতাগুলো হলে নিয়ে আসার সাহস করতে পারিনি। আব্বুকে বলেছিলাম, এগুলো আপনার কাছেই থাক, পরে সময় নিয়ে লিখব।
কিন্তু সেই ‘পরে’ আর আসেনি।
নিরাপত্তাজনিত কারণে আব্বুকে কিছুদিন পরপর বাসা পরিবর্তন করতে হতো। পরবর্তীতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আব্বুর হাতে লেখা সেই বইয়ের ড্রাফটের খাতাগুলো আর পাওয়া যায়নি। আম্মুও আব্বু যে বাসাগুলোতে ছিলেন, সেগুলোতে খোঁজ করেছেন। কিন্তু খাতাগুলোর আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
আজও মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। মনে হয়, তখন যদি আব্বুর লেখাগুলো কোথাও যত্ন করে রেখে দিতে পারতাম! হয়তো আজ আব্বুর সেই বইটি আমাদের হাতে থাকত। তাঁর চিন্তা, তাঁর অনুভূতি, তাঁর লেখা—সবকিছুর একটি মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকত।
আব্বুকে নিয়ে অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা করে। তাঁর জীবন, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর রাজনৈতিক পথচলা, তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়—অনেক কিছুই বলার আছে। কিন্তু আব্বুর জীবনের শেষ সময়ের শারীরিক কষ্টগুলোর কথা মনে পড়লে মনের ভেতর জমে থাকা রাগ, ক্ষোভ আর অভিমান সামনে চলে আসে। সেই অভিমানের অংশ আমার নিজের প্রতিও।
সবচেয়ে কষ্ট হয় আব্বুর ওপর হওয়া জুলুমের পরও যেন কারও মধ্যে কোনো বিকার নেই—এটা ভেবে।
যারা মিথ্যা মামলা করেছে, যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো তো দূরের কথা, তাদের কাছে কোনো জবাবদিহিও চাওয়া হয়নি। অন্যায়-অবিচারের সেই অধ্যায় যেন সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে গেছে।
এখনও কেউ আব্বুকে নিয়ে কোনো পোস্ট করলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সেখানে এসে ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে নোংরা মন্তব্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন মৃত মানুষের স্মৃতির প্রতিও ন্যূনতম সম্মান দেখানোর মানসিকতা যেন তাদের নেই।
আরেকটি প্রশ্ন আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়।
আব্বু যেদিন ইন্তেকাল করেন, সেদিন সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নিরাপত্তার কারণে বিষয়টি যেন প্রকাশ্যে জানানো না হয়। আমরা তখন সেটা মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কোনো একসময় সংগঠনের পক্ষ থেকেই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
জামায়াতের থানা বা জেলা পর্যায়ের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি শহীদ হলে বা ইন্তেকাল করলে সাধারণত মিডিয়া সেল থেকে তা জানানো হয়। কিন্তু আব্বু আজ ছয় বছর ধরে আমাদের মাঝে নেই। তিনি জেলা আমির ছিলেন, সংসদ সদস্য ছিলেন। অথচ তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ কখনো কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
গত ছয় বছরে থানা কিংবা জেলা পর্যায়েও সংগঠনের উদ্যোগে আব্বুকে স্মরণ করে একটি দোয়া মাহফিল বা কোনো কর্মসূচি করার সময় হয়নি—এটাও ভাবলে প্রশ্ন জাগে।
এই কথাগুলো কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য লিখছি না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা তৈরি করাও উদ্দেশ্য নয়। শুধু মনের ভেতর জমে থাকা কিছু প্রশ্ন আছে। কিছু অভিমান আছে। কিছু না-পাওয়া উত্তর আছে।
একজন সন্তানের কাছে বাবার স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। ছয় বছর পরও আব্বুর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে। তাঁর হাতে লেখা সেই হারিয়ে যাওয়া খাতাগুলোর কথা মনে পড়ে। তাঁর শেষ সময়ের কষ্টের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে করা অসম্পূর্ণ কথাগুলো।
আজ আব্বুর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু এটুকুই চাই—
আল্লাহ যেন আব্বুর জীবনের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন। তাঁর ওপর হওয়া জুলুমের ন্যায়বিচার আল্লাহর আদালতে প্রতিষ্ঠিত করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, কবরের জীবনকে শান্তিময় করুন এবং তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।
সবাই আব্বুর জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ আমার আব্বুকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমীন।