বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের জলাশয়সহ ৬৯ শতাংশ জমি দখল করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, রাতের আঁধারে ট্রাকে করে বালু এনে জলাশয়টি ভরাট করা হচ্ছে। এ ঘটনায় থানাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও ভরাট বন্ধ হয়নি। ইতোমধ্যে জলাশয়ের বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জমিটি সরকারি মালিকানাধীন। তবে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া কাগজপত্র ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমিটি দখলের চেষ্টা চলছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে জমির দখলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত রাকিবুল ইসলাম লিয়ন দাবি করেছেন, ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিকদের কাছ থেকে তারা পাওয়ার নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জলাশয়টি হাসপাতালের জমি হিসেবে পরিচিত। গত ২০ জুলাই থেকে হঠাৎ রাতের আঁধারে সেখানে ট্রাকে করে বালু ফেলা শুরু হয়। প্রথমে হাসপাতালের উন্নয়নকাজের জন্য জলাশয়টি ভরাট করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হলেও পরে স্থানীয়রা জানতে পারেন, কয়েকজন ব্যক্তি জমিটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা মূল্যের এ জমি ভরাটের পর প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি জমি কীভাবে ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেল—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এদিকে ভরাটকাজে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত থাকার নাম উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব বাবুল তালুকদার, মো. আলমগীর এবং এক যুবদল নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত রাকিবুল ইসলাম লিয়ন এ ভরাটকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া মহানগর বিএনপির এক নেতার নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভরাটকাজের ঠিকাদার জুয়েল বলেন, যাদের কাছ থেকে তিনি ভরাটের কাজ নিয়েছেন, তারা দুই ভাই-বোনের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছেন বলে তিনি জানেন। দিনের বেলায় নগরীতে ট্রাক প্রবেশে সমস্যা হওয়ায় রাতে বালু ফেলা হচ্ছে। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।
বক্ষব্যাধি হাসপাতালের অফিস সহকারী ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম বলেন, হাসপাতালের ৭ একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা তাদের কাছে রয়েছে। পর্চায় জমির মালিক হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টরের নাম উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কাউনিয়া থানাসহ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু জমিটি বেহাত হওয়া ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রতিরাতে বালু ফেলে জলাশয়টি ভরাট করা হচ্ছে।”
এ ঘটনায় থানাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও ভরাট বন্ধ হয়নি
বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মাসুমা আক্তার বলেন, “পরিত্যক্ত জলাশয়টি রাতের আঁধারে কে বা কারা ভরাট করছে। এ বিষয়ে কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কেও জানানো হয়েছে। এসিল্যান্ড জানিয়েছিলেন, জমির চারপাশে বেড়া দেওয়া হবে। কিন্তু রাতের আঁধারে দখলদাররা গাছপালা কেটে নিজেরাই বেড়া দিয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ঘুরে গেলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
তবে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাকিবুল ইসলাম লিয়ন। তিনি বলেন, “ওয়ারিশ সূত্রে স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল আকন ও তার বোন এ জমির মালিক। তাদের কাছ থেকে আমি এবং আরও তিন জন মিলে জলাশয়সহ মোট ৬৯ শতাংশ জমির পাওয়ার নিয়েছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মিথ্যাচার করছে এবং ভুয়া কাগজপত্র দেখাচ্ছে।”
তবে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, “বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশের জলাশয়টি খাস খতিয়ানের জমি। প্রায় ১৫ বছর আগে জরিপে বিএস রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। আমার ধারণা, এই প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।”
তিনি বলেন, “জমি তাদের কাছে কীভাবে গেলো, তা চ্যালেঞ্জ করে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে। জিপিকে এ মামলার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জমিটি বিক্রির জন্য দলিল করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সে দলের হোক বা বাইরের হোক। বক্ষব্যাধি হাসপাতালের জমি কোনোভাবেই দখল করতে দেওয়া হবে না। এ ঘটনায় আমার পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, “সরকারি জমি কোনোভাবেই বেহাত হতে দেওয়া যাবে না। দখলদারমুক্ত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”