আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক ব্যয় ও জটিলতা হ্রাস এবং বৈদেশিক লেনদেনে গতিশীলতা আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ জারি করেছে সরকার। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে শিল্প কাঁচামাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতেই নীতিমালা আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় আমদানিকারকদের দীর্ঘদিন ধরে চলা এলসি খোলার বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা প্রায় তুলে নেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় বাণিজ্য খাতকে আধুনিক ও বৈশ্বিক পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে তুলবে।
পূর্ববর্তী নীতিমালায় পারচেস কনট্রাক্ট বা টিটির মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ মার্কিন ডলারের যে নির্দিষ্ট সীমা ছিল, নতুন আদেশে বাণিজ্যিক ও শিল্প আমদানিকারক উভয়ের জন্যই সেটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। ফলে এখন ব্যাংক এলসির দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী সরাসরি যেকোনো অঙ্কের পণ্য আমদানি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মোটরযান আমদানিতে ১৬৫ সিসির সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি ক্ষমতার ইঞ্জিনসম্পন্ন সিবিইউ মোটরসাইকেল আমদানির অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে অতিরিক্ত ছাড় এবং দেশে ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ ও ‘সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ’ কাঠামোর নীতিগত রূপরেখা যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশের মোট আমদানি বাজেটের বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক পণ্য ও শিল্পের জন্য ব্যয় হয়। দেশের শীর্ষ আমদানি হওয়া পণ্যের তালিকার প্রথমেই রয়েছে পোশাকশিল্পের প্রাথমিক উপাদান যেমন— কাঁচা তুলা, বিভিন্ন ধরনের সুতা, ফেব্রিকস ও কেমিক্যালস। নতুন নীতিমালায় রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বাড়াতে এসব কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় দ্রুত খালাসের জন্য ছাড়পত্র ব্যবস্থা নমনীয় করা হয়েছে।
আমদানি হওয়া পণ্যের তালিকায় দ্বিতীয় বৃহৎ খাত হলো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা— যেমন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং কয়লা। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর ওঠানামার সময় বাণিজ্যে গতি ফেরাতে পেমেন্ট শর্ত নমনীয় রাখা হয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা মূলধনি প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ। ভারী কারখানা স্থাপন সহজ করার লক্ষ্যে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য পূর্ববর্তী নীতিমালায় বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ডিক্লারেশন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
এর বাইরে দেশের বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি উৎপাদনে গতি আনতে যেসব নিত্যপণ্য যেমন— সার, অপরিশোধিত ভোজ্য তেল, খাদ্যশস্য (গম, মসুর ডাল, ছোলা) এবং লৌহ ও ইস্পাত আমদানি করা হয়, সেগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। বিএসটিআই সনদের শর্ত কঠোর হলেও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোয় বন্দর থেকে এসব পণ্য দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং পছন্দনীয় বাণিজ্য সুবিধা কমে আসবে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ২০২৬-২৯ নীতিমালায় কৌশলগত বাণিজ্য নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আগের নীতিমালায় বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তির যেসব বাধ্যবাধকতা আংশিক কার্যকর ছিল, নতুন নীতিতে সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিজিটালাইজেশন বা ডিজিটাল ট্রেড সিস্টেম চালুর অংশ হিসেবে এখন থেকে সব আমদানির কাগজপত্র অনলাইনে জমা দেওয়া এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ই-ক্লিয়ারেন্স গ্রহণের সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বন্দরে জাহাজের জট বা কনটেইনারের ডেমারেজ চার্জ অনেকাংশে কমে আসবে, যা ব্যবসায়ীদের পণ্য উৎপাদনের সময় ও ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
বিভিন্ন ইতিবাচক সংস্কারকে স্বাগত জানিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য সহজীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, নতুন আমদানিনীতি আদেশের উদ্যোগগুলো মূলত ব্যবসাবাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। সরকার তাদের বাজটে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যবসায়ের খরচ কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমার মনে হয় এসব পদক্ষেপ তারই বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি বললেন, দেশে এতদিন সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ কিংবা মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট ও আধুনিক আইনি কাঠামোর বড় অভাব ছিল। ২২ বছর ধরে আমরা এ দাবি জানিয়ে আসছি। স্বস্তির বিষয় হলো, নতুন নীতিমালায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিলম্বে হলেও আমাদের এ দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কিছু আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘খেয়াল রাখতে হবে, এ নতুন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন যেন তৈরি না হয়। অতীতে আমরা অনেক সময় দেখেছি— নীতিমালা অত্যন্ত চমৎকার ও ইতিবাচক হয়, কিন্তু পরে এমন কিছু আইন বা বিধি জারি করা হয়, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন ও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য বজায় রেখে বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’