অনলাইনে নির্ধারিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অর্ডার দিলে বাসায় বা নির্ধারিত ঠিকানায় বসেই মিলছে এমন কিছু নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক, যেগুলো ব্যবহার করে হেরোইন ও এলএসডির মতো ভয়ংকর মাদক বানানো সম্ভব। সাইবার স্পেসে নজরদারি করতে গিয়ে এমন তথ্য পেয়ে চোখ কপালে ওঠে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্তাদের। বিষয়টি যাচাই করতে অনলাইনে রাসায়নিক বিক্রির একটি প্ল্যাটফর্মে রাসায়নিকের অর্ডার দেওয়া হয়। এরপর নির্ধারিত সময় ও লোকেশনে সেই রাসায়নিক নিয়ে হাজির হয় ওই প্ল্যাটফর্মের ডেলিভারিম্যান। এ সময় ছদ্মবেশে সেখানে অবস্থান করা ডিএনসির গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সেই ডেলিভারিম্যানকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয় অনলাইনে রাসায়নিক বিক্রির সেই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে। সেখান থেকে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ জব্দ করা হয় মোট সাড়ে ৬ লিটার নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক। গ্রেপ্তার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে। এ প্রতিষ্ঠানটি হলো বাংলাদেশের কেমিক্যাল ব্যবসার সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইট ‘ই-কেম.কম.বিডি’। প্রতিষ্ঠানটি কেমিক্যাল ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ংকর সব মাদক তৈরির উপকরণ বিক্রি করে আসছিল। এ প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজেও মাদক বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, যে ঘটনায় মামলা করা হয়েছে দারাজের বিরুদ্ধেও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র ছাড়াই এসব নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক অনলাইনে বিক্রি করা হচ্ছিল। অর্ডার নেওয়া থেকে শুরু করে বাসায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছিল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এসব রাসায়নিক নিয়ন্ত্রিত এবং এগুলো আমদানির অনুমতি রয়েছে শুধু হাতে গোনা কয়েকটি ফার্মাসিস্ট কোম্পানির। এসব রাসায়নিক দিয়ে ব্যথানাশক ওষুধ ও প্যারাসিটামল ধরনের মেডিসিন তৈরি করা হয়। এসব রাসায়নিক সাধারণ মানুষের হাতে বা খোলা বাজারের বিক্রির কোনো অনুমোদন নেই। কারণ এসব রাসায়নিক দিয়ে হেরোইন ও এলএসডির মতো ভয়ংকর মাদক বানানো সম্ভব।
অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক বিক্রি: ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাইবার পেট্রোলিংয়ে ধরা পড়ে—ই-কেম (ECHEM) নামের একটি ই-কর্মাস প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, লাইসারজিক অ্যাসিড এবং ৩, ৪-মিথাইল এনিডাইঅক্সিফেনাইল-২-প্রোপাননসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে ক্রয়-বিক্রয় করছে। এসব রাসায়নিক অবৈধ মাদকদ্রব্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এমনকি এসব রাসায়নিক দিয়ে হেরোইন ও এলএসডির মতো ভয়ংকর মাদকও বানানো সম্ভব। তথ্য পাওয়ার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রথমে ই-কেমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড অর্ডার করেন এবং অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেন। এরপর একটি গোয়েন্দা দল ২৪ আগস্ট অভিযান পরিচালনা করে। সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে গুলশানের নিকেতন গেটের নিকেতন সোসাইটি গার্ড অফিসের সামনে ই-কেমের পণ্য সরবরাহকারী বা ডেলিভারিম্যানকে আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি নিজেকে মো. মঞ্জুরুল ইসলাম এবং ই-কেমের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। এ সময় তার কাছ থেকে ই-কেমের দুটি পার্সেল জব্দ করা হয়। একটি পার্সেলে ছিল ৫০০ মিলিলিটার অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড। অন্যটিতে ই-কেমের লোগোযুক্ত চারটি এক লিটারের বোতলে চার লিটার হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং এক লিটারের বোতলে এক লিটার অ্যাসিটোন পাওয়া যায়।
ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, মঞ্জুরুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পার্সেল সরবরাহ করেন। পার্সেলের ভেতরে কী থাকে, তা তিনি জানেন না। তবে তিনি ই-কেমের অফিসের ঠিকানা জানান। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতেই কুড়িলের প্রগতি সরণির একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলায় ই-কেমের ভাড়া করা অফিসে অভিযান চালায় ডিএনসির গোয়েন্দা দল। সেখান থেকে একজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে ই-কেমের ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারী বলে পরিচয় দেন। তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা তল্লাশি করে একটি কাচের বোতলে ৫০০ মিলিলিটার সালফিউরিক অ্যাসিড এবং একটি প্লাস্টিকের বোতলে ৫০০ গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট পাওয়া যায়। একই কক্ষ থেকে দুটি কম্পিউটার সিপিইউ, একটি এইচপি মনিটর, চারটি মোবাইল ফোন এবং প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ই-ট্রেড লাইসেন্সও জব্দ করা হয়।
ডিএনসি সূত্র বলছে, সব মিলিয়ে অভিযানে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ মোট ৬.৫ লিটার বা ৬ হাজার ৫০০ মিলিলিটার রাসায়নিক জব্দ করা হয়। জব্দ করা রাসায়নিকগুলো সংরক্ষণ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বলা হলেও আব্দুল মোমিন পাটোয়ারী তা দেখাতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেসব রাসায়নিক বিক্রি করা হচ্ছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে নেই। ই-কেমের ম্যানেজার এসব রাসায়নিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে খোলা বাজারে বিক্রির বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। একইভাবে এসব রাসায়নিকের মূল উৎস সম্পর্কেও তিনি তথ্য দিতে পারেননি। যে কারণে তাকে আটক করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, বিক্রির উদ্দেশ্যে অবৈধ মাদকদ্রব্য তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মজুত ও সংরক্ষণের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত ২০২৬)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। জব্দ করা মূল আলামত ও গ্রেপ্তারকৃত আসামি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হেফাজতে রয়েছে। এদিকে জব্দ করা চার ধরনের রাসায়নিকের নমুনা আলাদাভাবে সংগ্রহ করে সিলগালা করা হয়েছে। অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট থেকে ২০ মিলিলিটার করে মোট ৮০ মিলিলিটার নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাসায়নিক পরীক্ষক (রাজশাহী) মো. শফিকুল ইসলাম সরকার কালবেলাকে বলেন, ‘অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড হেরোইন তৈরিতে কাজে লাগে। এটা ছাড়া হেরোইন হবে না। ৫০০ গ্রাম অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড দিয়ে ৮৯০ গ্রাম হেরোইন বানানো সম্ভব। আর অ্যাসিটোন দিয়ে কোকেন, এলএসডি ও কিটামিনের মতো ভয়ংকর মাদক বানানো হয়। অ্যাসিটোন ছাড়া এসব মাদক বানানো সম্ভব নয়। আর সালফিউরিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে কোকেন, ইয়াবা ও হেরোইন বানানো হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাড়ে ৬ কেজি কেমিক্যাল দিয়ে ১০ থেকে ১২ কেজি মাদক বানানো সম্ভব।’
গ্রেপ্তার আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে ডিএনসি সূত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তারকৃত আসামি জানিয়েছেন তারা এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি এই ধরনের রাসায়নিকের ডেলিভারি দিয়েছেন। সেই ৩০টি ডেলিভারি কারা নিয়েছেন এবং তারা এসব রাসায়নিক নিয়ে কী করেছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বেশ কয়েকবার ই-কেম.কম.বিডি হটলাইন নম্বরে ফোন দেওয়া হলেও কেউ রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (গোয়েন্দা-ঢাকা) মো. মেহেদি হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, ই-কেম নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে বিক্রি করা হচ্ছে, যার মধ্যে এমন কিছু কেমিক্যালও রয়েছে, যা মাদকদ্রব্য প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, যা হেরোইন ও এলএসডি তৈরিতে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিকার্সর কেমিক্যাল, তাদের প্ল্যাটফর্মে বিক্রির বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাইবার প্যাট্রলিং ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মটিকে নজরদারিতে রাখা হয়। পরে তদন্তের স্বার্থে আইনানুগ পদ্ধতিতে একটি কন্ট্রোলড অনলাইন পারচেজ পরিচালনা করা হয়। অর্ডারকৃত অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড সরবরাহের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং তাদের হাতেনাতে আটক করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সংশোধিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, ডিজিটাল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্যের প্রচার, বিজ্ঞাপন, সরবরাহ বা কেনাবেচায় সহায়তা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে সাইবার প্যাট্রলিং ও অনলাইন গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করেছে। আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স সাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা মাদক প্রস্তুতের উপকরণ অবৈধভাবে প্রচার, বিক্রয় বা সরবরাহের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জানতে চাইলে ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সাইবার প্যাট্রলিং করছি। যারা এই সকল কাজের সঙ্গে জড়িত আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। খুব দ্রুতই আপনারা রেজাল্ট দেখতে পাবেন।’
দারাজে বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘সিবিডি তেল’ নামে টিএইচসি বিক্রি, কেমিস্ট গ্রেপ্তার: ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজে বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘সিবিডি তেল’ নামে দীর্ঘদিন ধরে টিএইচসি মাদক বিক্রির অভিযোগে মোহাম্মদ আনিসুর রহমান নামে এক কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ক্রেতা সেজে মাদক সংগ্রহ ও রাসায়নিক পরীক্ষায় টিএইচসির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ফাঁদ পেতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিএনসি সূত্র জানায়, দারাজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা তরল পদার্থটি পরীক্ষা করে এতে উচ্চমাত্রার টিএইচসি পাওয়া যায়। পরে কর্মকর্তারা ক্রেতা সেজে তিন বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার মাদকের অর্ডার দেন। ১৬ আগস্ট ওই পার্সেল নিয়ে আসা দারাজের ডেলিভারিম্যান মো. নাঈমকে সেগুনবাগিচা থেকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাড্ডার সাঁতারকূলের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আনিসুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তার কাছ থেকে ৬২০ মিলিলিটার টিএইচসি উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেটজাত করার সরঞ্জাম, ৫০টি কাচের বোতল, দারাজের লোগোযুক্ত প্যাকেট, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে দারাজ ব্যবহার করে প্রায় ৪০৫ বোতল টিএইচসি বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পেশায় কেমিস্ট আনিসুর সাবান তৈরির ব্যবসার আড়ালে মাদক বিক্রিতে জড়ান। ভারত থেকে অবৈধ পথে এসব মাদক এনে ‘সিবিডি তেল’ বা ‘অ্যারোমেটিক অয়েল’ নামে অনলাইনে বিক্রি করা হতো। এ ঘটনায় আনিসুর রহমানের পাশাপাশি দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও আসামি করে মামলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দারাজ বাংলাদেশের হেড অব কমিউনিকেশন মোহাম্মদ রাইসুল ইসলাম বাপ্পীকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ কালবেলাকে বলেন, জব্দকৃত রাসায়নিকের মধ্যে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন ও সালফিউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লিটার। এর মধ্যে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড মাদক তৈরির একটি অন্যতম উপাদান এবং এটি খোলাবাজারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি শুধু অনুমোদিত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা রপ্তানিমুখী শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে আটককৃতরা কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
এই কেমিক্যালগুলো কীভাবে বাইরে এলো, তা নিয়ে তদন্ত চলছে উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, এটি মূলত দুভাবে হতে পারে। প্রথমত, আমদানিকারকরা মিথ্যা ঘোষণা (মিস ডিক্লারেশন) দিয়ে কনটেইনার বা ড্রামের ভেতরে করে এগুলো নিয়ে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, যাদের বৈধ লাইসেন্স আছে, তারা হয়তো প্রশাসনের অজান্তে চোরাপথে এগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে ও কারা এই কেমিক্যালগুলো কিনেছে তা জানতে বর্তমানে তদন্ত চলছে। জব্দকৃত কেমিক্যাল দিয়ে হেরোইন ও এলএসডির মতো মারাত্মক মাদক তৈরি করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নজরে আসতেই আমরা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়েছি।’
ডিএনসি ডিজি বলেন, ‘আগে তথ্যের ঘাটতি ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনলাইনে অভিযান চালানো সম্ভব না হলেও, নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সুফল হিসেবে এখন অনলাইন অপরাধীদেরও দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হয়েছে। কেউ অনলাইনে মাদকের প্রচার চালালেও তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। মাদক ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও সেবনকারীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে মহাপরিচালক বলেন, নতুন আইনে অবৈধ ও নেশাজাতীয় মাদক বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কঠোর নজরদারি বজায় রাখছে। মাদকের সঙ্গে যাদেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী অপরাধীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ডিজিটাল ট্র্যাকে ‘ডিলিট’ বলে কিছু নেই। অনলাইনে বা ডিভাইসে অপরাধের প্রমাণ বা ট্রেইল থেকেই যায়। যারা অনলাইনে মাদকের অবৈধ কারবার করছে, তাদের ডিজিটাল ট্রেইল শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।