দেশের চলমান বিদ্যুৎসংকট পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দেশের গ্যাসভিত্তিক যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদন করতে পারছে না, সেগুলোর পরিবর্তে দ্রুত সময়ের মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রুফটপ ও ল্যান্ডবেইজড সোলার দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্রুতগতিতে সোলার রুফটপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ পরিমাণে তেল ও কয়লা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্যাসের সংকট কাটাতে নতুন গ্যাসকূপ খনন কার্যক্রমে জোরদার করা হয়েছে। নতুন নতুন উৎস থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সংগ্রহেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশ ব্যয়বহুল, তারপরও সংকটকালীন বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। যদিও এখন বৃষ্টি হলেও বিদ্যুতের চাহিদা কিন্তু কমে না। তিনি বলেন, ‘এখন বাসাবাড়িতে অনেকেই ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করেন। এতে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়। আবার শিল্পকারখানাগুলোতেও বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। ক্রাশ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে রুফটপ ও ল্যান্ডবেইজড সোলার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাচ্ছি। এ ছাড়া তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ উৎপাদনের জন্য আরও বেশি জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে এখন তেল ও কয়লার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে। লোডশেডিং কমাতে তেল ও কয়লায় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যেহেতু বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে গেছে তাই নতুন গ্যাসক্ষেত্র খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ভবন থেকে শুরু করে সব সরকারি ভবনে রুফটপ সোলার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন উৎস থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে এলএনজি আনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন উৎস থেকেও এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন এলএনজির দাম বেশি। এই গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে তা থেকে কিছু গ্যাস যদি শিল্পে দেওয়া যায় তাহলে শিল্প খাত বাঁচবে। আর বর্তমানে সংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে হবে। বকেয়ার কারণে এখন আড়াই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যেতে পারছে না। এগুলোর বকেয়া পরিশোধ করে সরকারকে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এলএনজির চেয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ কম। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদনে যাওয়াই হবে দ্রুত সমাধান। তবে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি করতে হবে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এই খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। আর রুফটপ সোলারকে বেসরকারি খাতে দেওয়া যেতে পারে। সোলারে গ্রিড সংযোগের ক্ষেত্রে বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারি সহযোগিতা বাড়াতে হবে।