Image description
বরাদ্দ পুরোপুরি উত্তোলন না করে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট, আওয়ামী লীগ আমলের ডিলাররা পলাতক

সরকারি গুদামে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। পাইপলাইনেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ সার, আসছে নতুন চালানও। অথচ আমন মৌসুমের ভরা সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক সার না পেয়ে দোকানে দোকানে ঘুরছেন। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে, কোথাও সারের জন্য মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন কৃষক। আবার ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকার বলছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে কিছু ডিলার সার উত্তোলন ও বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। কোথাও অবৈধ মজুত, কালোবাজারি এবং এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে-সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন?

ফলে আমন মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষককে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। সরকার যেখানে সংকট নেই বলছে, সেখানে মাঠে সার না পাওয়া, অতিরিক্ত দাম আদায়, পাচার ও কালোবাজারির অভিযোগ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, আগস্টে দেশে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন। টিএসপির বরাদ্দ ৬৮ হাজার ৭৫৩, ডিএপির ৮৮ হাজার ৭৭৮ এবং এমওপির ৭৭ হাজার ৬৪০ টন। ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, আগস্টে টিএসপির চাহিদা প্রায় ৬৯ হাজার টন, বিপরীতে মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। ডিএপির চাহিদা ৮৯ হাজার টনের বিপরীতে মজুত ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন। এমওপির চাহিদা ৭৮ হাজার টন হলেও মজুত রয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার টন। অন্যদিকে ইউরিয়ার চাহিদা ২ লাখ ৭৯ হাজার টন হলেও মজুত রয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার টন। অর্থাৎ সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, আগস্টের চাহিদার তুলনায় দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

কৃষিবিদদের মতে দেশে সারের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই; বরং কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে অনেক ডিলার সার বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো ডিলার তাঁদের বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন না। সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলার বর্তমানে এলাকায় অনুপস্থিত বা পলাতক থাকায় তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সার বিক্রি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সরকারি গুদামে সার থাকলেও কৃষক তা পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতির পেছনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাঠপর্যায়ের তদারকির দুর্বলতাকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিলারদের সার উত্তোলন, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি না থাকায় কৃত্রিম সংকট, কালোবাজারি এবং এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সার পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত পরিবেশকদের দোকানে এখন সারের জন্য ভিড় করছেন কৃষক। কিন্তু এক দোকানে ডিএপি থাকলেও নেই ইউরিয়া, অন্য দোকানে টিএসপি থাকলেও মিলছে না ডিএপি। আবার যেখানে সার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায়ও কৃষককে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে। রাজশাহীতে আমন মৌসুমে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত ৪ হাজার ৬০০ টন সার বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। চাহিদাপত্রে ১ হাজার ৮০০ টন টিএসপি, ২ হাজার টন ডিএপি ও ৮০০ টন এমওপি চাওয়া হয়েছে। রংপুরেও বিএডিসির প্রায় ৮০০ ডিলার চাহিদামতো সার ও বীজ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের সংকট কেন্দ্র করে ডিলারের গুদাম ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান কৃষক। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জেও পর্যাপ্ত সার সরবরাহের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান কৃষক। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৭২ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ সারের মধ্যে ইউরিয়া, জিপসাম, ডিএপি, টিএসপি ও পটাশ রয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য, কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কেউ অবৈধভাবে মজুত বা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে বিক্রি ও বিতরণব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। কোনো ডিলার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করলে বা নির্ধারিত এলাকার বাইরে সার সরিয়ে নিলে তা কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা, উপপরিচালক ও জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যেখানে সারের চাহিদা বেশি, সেখানে অতিরিক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারেন।’ এ বিষয়ে কৃষি সচিব সেলিম খান বলেন, ‘গতবারের চেয়ে সারের মজুত বেশি রয়েছে। সার নিয়ে ন্যূনতম কোনো সংকট নেই। কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেজন্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারও গাফিলতি সহ্য করা হবে না। গুদাম থেকে কৃষকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত সার বিতরণব্যবস্থায় নিবিড় নজরদারি করা হবে। মোবাইল কোর্ট ও অভিযান আরও বাড়ানো হবে।’

সার উত্তোলন, বিতরণ ও সার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তার জন্য তিন সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, কোনো কোনো এলাকায় সার বিতরণে অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। গতকাল সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জাহেদ উর রহমান বলেন, আমরা বিষয়টি খেয়াল করেছি এবং এ জন্য সরকার খুব দ্রুত ব্যবস্থাও নিচ্ছে। যেখানে সমস্যা হয়েছে, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বদলি করে নতুন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত সারও রক্ষিত আছে। তবে সরকার সারের বিতরণব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে কিছু সমস্যা হচ্ছে। কোনো কোনো ডিলার তাদের বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন না। এ ধরনের কিছু ঘটনার কারণে কোনো কোনো এলাকায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি বেশি দিন থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাজশাহী ও রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি]