হঠাৎ করেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট কেন? ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেন এত সংকট হয়নি? বিদায়ি দুই সরকারের আমলের মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় না থাকার কারণ কী? এর পেছনে ‘অন্য কিছু’ আছে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে বাংলাদেশ প্রতিদিন। অনুসন্ধানে জানা গেছে পর্দার আড়ালে গভীর রাজনৈতিক ‘স্যাবোটাজ’-এর তথ্য। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে আবার মাঠে আসার সুযোগ তৈরি করতে চায়। পর্দার আড়ালে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার বাইরেও বিদ্যুৎসংকটের পেছনে রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের স্যাবোটাজ। তেল নিজেদের সংরক্ষণে রেখেও সরকারকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাদের সঙ্গে স্যাবোটাজে ইন্ধন দিচ্ছেন বিগত সরকারের আমলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও নেতারা। তাঁদের পরামর্শে আওয়ামী লীগ সমর্থক সাবেক ও বর্তমান কতিপয় আমলা, পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করেপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কর্মকর্তা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা এ স্যাবোটাজের নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন।
বিদ্যু বিভাগের হিসাব অনুসারে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট এবং সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। মাসখানেক ধরে বিদ্যুতের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্য সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে; যা গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড। এ বিদ্যুৎসংকটের কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও কয়লাসংকটকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির বাইরে প্রতিবেশী দেশের ভূমিকার কারণেও বিদ্যুৎ নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটি প্রকাশ্যে বিদ্যুৎ দিলেও অন্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আগামী ডিসেম্বরে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানিসংকট প্রকট হয়েছে। এ সংকট সৃষ্টির পেছনে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী বিভিন্ন মহল তৎপর রয়েছে। বিগত সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু লীগ সমর্থক বিভিন্ন আমলার কাছে টেলিফোনে যোগাযোগ করে দেশে বিদ্যুৎসংকট সৃষ্টি করায় ইন্ধন দিচ্ছেন।
সূত্র জানান, বাইরে অবস্থান করা নসরুল হামিদ বিপুর দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে। বিপুর নির্দেশে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু প্রভাবশালী আমলা এখনো পর্দার আড়ালে এ খাত অস্থির করে তুলতে অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভিতরের একটি চক্র বিশেষ করে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে বিগত সরকারের থেকে সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী, বিপিসি ও পেট্রোবাংলার কিছু কর্মকর্তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শেরও একটি মহল এ সরকারকে ব্যর্থ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎসংকটের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিদ্যুৎসংকট চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে যাওয়ার পর সরকারের কাছে বকেয়া দাবি করেছে দেশের বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা। এর আগে দুই সরকারের কাছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা বিভিন্ন সময় তাঁদের বকেয়া টাকা দাবি করেও পাননি। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার ছয় মাসের মধ্যেই তাঁদের এ টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
সূত্র জানান, এ সংকটময় পরিস্থিতিতে অতীত সরকারের আমলের বকেয়া দাবির পেছনেও আছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপুর সৃষ্ট সিন্ডিকেট। বিপুর আমলে সুযোগ পাওয়া এসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে-বেনামে তৎকালীন সরকারের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কিছু কোম্পানির মালিকরা ক্যাপাসিটি চার্জ শোধ এবং ‘কমিশনের’ ভাগ পেতে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করেছেন। এ সিন্ডিকেটটি সচিবালয়ে প্রশাসনের ভিতরের আওয়ামী সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা একটি অংশ এবং বিরোধী দল মতাদর্শের আরেকটি গোষ্ঠীর একটি জোট নিয়ে গঠিত হয়েছে। তারা সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এদের চক্রান্তেই বিদ্যুৎসংকট আরও বাড়িয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ গড়ে তোলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করলে এখনই আমাদের কাছে যে তেল সংরক্ষণ আছে, সেটিও কাজে লাগাতে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল বাড়িয়ে দিতে পারব। আমরা সরকারকে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিতে রাজি আছি। আবার সরকার আমাদের টাকা দিলে তেল আনতে সিঙ্গাপুর থেকে তিন সপ্তাহ লাগবে।’
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, এর আগে সব সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের ৫০টির ওপর বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় গ্রিডে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সংযুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত না হলে দেখা দেবে নতুন প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট নিয়মের গতিতে চলে। ক্ষমতাচ্যুত ও অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে লোডশেডিং কম থাকলেও বিএনপি সরকার আসার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের এ সংকট প্রশ্ন তুলেছে। সেখানে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সংকট সৃষ্টি প্রশ্নের উদ্রেক করে। এর পেছনে কারা আছে, তা তদন্তের দাবি রাখে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে সংস্কারের ফলে এ খাত থেকে স্বার্থান্বেষী মহল মুনাফা নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবাধে লুণ্ঠন করেছেন, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। নানাভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। সে সরকার এ খাত থেকে বেশি বেশি রাজস্ব আহরণ করেছে। এ কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সর্বনাশ হয়েছে; যার পরিণতিতে এখন দেশ বিদ্যুৎসংকটের মধ্যে পড়েছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে সংকট তৈরি হয়েছে ১৫-১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারকে দোষ দেওয়া যাবে না। ২০১০ সাল থেকে জ্বালানিতে আমরা যে আমদানিনির্ভরতার দিকে গিয়েছিলাম এটিই সংকটের মূল কারণ। আমাদের বর্তমানে যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে, সেখানে আমরা সর্বোচ্চ ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি এলএনজি রাখতে পারি না। অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ভুল হয়েছে দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি বাতিল করা। এটি না করলে এখন অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করে সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত।’
সূত্র জানান, দেশে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। এসব এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বিপুর লোকদের নিয়ন্ত্রকের আসনে বসানো হয়েছে। অভিযোগ আছে, তাঁরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোডশেডিং কারিগরিভাবে দেখানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। যেখানে বিদ্যুতের এক ঘণ্টা লোডশেডিং দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, সেখানে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের এ অবস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, ‘সাধারণত দেশের এ ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিতে একটি মহল সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ থেকে বিভিন্ন জায়গায় অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনাটি অন্য খাতে প্রবাহিত হতে পারে বা কোনো একটি মহল এ ঘটনা থেকে সুবিধা নিতে পারে-এ আশঙ্কা থেকে সতর্কতার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা চেয়ে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছি। এ ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় এরই মধ্যে পুলিশ প্রশাসন নাশকতা রোধে টহল দিয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘বিদ্যুৎসংকট সমাধানে সরকার যে আশা আমাদের দিয়েছে, তার ওপর আস্থা রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বসে এ সমস্যা খুব দ্রুত সামাল দিতে পারবেন। এ সমস্যা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসাই হবে সরকারের টপ মোস্ট প্রায়োরিটি।’
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সমুদ্রসৈকতে আয়োজিত সমাবেশেও অভিযোগ করেছেন জ্বালানি খাত অস্থির করতে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের আরও বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিও একই অভিযোগ করেছেন।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিদ্যুতের সংকট কমবেশি অতীতেও ছিল। দেশে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার নিয়ে আগে কোনো সমস্যা ছিল না, তাহলে এ বিষয়টি হঠাৎ করেই কেন সামনে এলো? স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মিটারে তা আসবে। নারায়ণগঞ্জে আমাদের মিটার ভাঙা হলো। আর এটা ভেঙেছেন যে লোকটি, তিনি সেভেন মার্ডার মামলার আসামিকে সহযোগিতা করেছিলেন। এটা এক ধরনের ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগ আমলেও মিটার লাগানো হয়েছিল, কিন্তু তখন কোনো বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন বা সংশ্লিষ্টদের ধাওয়া দেওয়া হয়নি। এখন হচ্ছে। এটা ষড়যন্ত্র।’