Image description

দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনও শীত ও বৃষ্টির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সারা দেশে অব্যাহত লোডশেডিংয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আর কতদিন এই ভোগান্তি পোহাতে হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ ও উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোডশেডিং থেকে পুরোপুরি মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে আগামী শীত পর্যন্ত। অবশ্য আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গরমের প্রকোপ কমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় এক মাস। সব মিলিয়ে আগামী অক্টোবর নাগাদ লোডশেডিং থেকে মুক্তি মিলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তারও বেশি উঠতে পারে। বিপরীতে শীতকালে তাপমাত্রা অনেকটাই কমে যায়। এ সময় দিনের তাপমাত্রা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এবং রাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় কোনও কোনও সময় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচেও নেমে যেতে পারে।

শীতে সারা দেশে রাতের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মেগাওয়াট। দিনের বেলা এই চাহিদা নেমে যায় ৯ হাজার মেগাওয়াটে। ফলে শীতে বিদ্যুতের কোনও সংকট থাকে না। বরং বিদ্যুতের সরবরাহে স্বস্তি থাকে বিদ্যুৎ বিভাগ, পিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। বর্ষাকালেও এই সুবিধা থাকে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও কমে যায়। তবে শীতের মতো বর্ষায় টানা স্বস্তি থাকে না। কারণ ঝড়-বৃষ্টির ফাঁকে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে এবং তখনই লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

চলতি বছরের বিদ্যুতের হিসাব বলছে, শীতে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৯ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট। কোনও কোনও সময় তা কিছুটা বাড়তে পারে। দিনের বেলা চাহিদা থাকে ৯ হাজার মেগাওয়াট এবং রাতে বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার মেগাওয়াটে। অন্যদিকে গ্রীষ্মে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এতে কোনও কোনও দিন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।

শীতে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ পেলে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালালেই আর কোনও সংকট থাকে না। এরপর ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। সব মিলিয়ে শীতে কোনও সংকটে পড়তে হয় না।

সাধারণত বছরের শেষ দিকে অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির এই স্বস্তি শুরু হয়। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পর পরের বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ পর্যন্ত এই সুবিধা থাকে। দেশে বিদ্যুতের মূল সংকট থাকে এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে জুলাই ও আগস্টে বৃষ্টির কারণে কোনও কোনও দিন তাপমাত্রা কম থাকায় চাহিদাও কিছুটা কম থাকে। এতে লোডশেডিংও কম করতে হয়। কিন্তু চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলে লোডশেডিং করা ছাড়া কোনও বিকল্প থাকে না।

এখনও তীব্র গরম, বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা এবং গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছে মানুষ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গ্রামের অবস্থা আরও খারাপ। পরিস্থিতি থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

রাজধানীতে দিনে-রাতে মিলিয়ে গড়ে চার-পাঁচবার এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীর সাধারণ মানুষ।

পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা সবিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘দিনের বেলা কম যায় বিদ্যুৎ, একবার বা দুইবার। সন্ধ্যার পরে কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়। গরমের মধ্যে এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়  শ্বশুর আর আমার বাচ্চাগুলোর। গরমে ঘেমে-নেয়ে যায়। খালি গায়েও শান্তি মেলে না ওদের। অনেকে তো এই সময় রাস্তায়ও আজকাল নেমে যায়, যাতে বাইরে গেলে হালকা বাতাস লাগে গায়ে।’

মিরপুরের মেঘলা আক্তার বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে গরম তো লাগছেই। দিনের কাজও আটকে যাচ্ছে সব। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুতের চুলা কিনেছিলাম। এখন বিদ্যুৎ গেলে রান্না বন্ধ হয়ে যায়। আবার হয়তো পানি নেই, মোটর ছাড়লাম বিদ্যুৎ চলে গেছে। তখন পানি তোলা যাচ্ছে না। আর গরমের ভোগান্তি তো আছেই। এতদিন ঢাকার বাইরে হলেও ঢাকায় এত লোডশেডিং ছিল না। গত কয়েক দিনের গরমে লোডশেডিংয়ে সবার অবস্থা খারাপ।’

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাবে, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টার দিকে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ২৯৫ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিদ্যুতের চাহিদা না কমা পর্যন্ত সংকট কাটার সম্ভাবনাও কম। বিশেষ করে গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি থাকায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি এক সেমিনারে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতিতে আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউ’র অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পে গ্যাস-সংকট কমাতে বিকল্প নানান উপায় খোঁজা হচ্ছে। এর মধ্যে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস কারখানায় পৌঁছে দিতে একটি কোম্পানিকে ৩০টি ট্রাক চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা তৈরি করতে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছে সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আপাতত লোডশেডিং কমতে পারে যদি কিছুটা জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো যায়। কিন্তু ভোগান্তি থেকে মুক্তির উপায় এই মুহূর্তে সরকারের হাতে নেই। কারণ তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। আবার গরম বেশি থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। সেটাও সরকারের পক্ষে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। এই অবস্থায় লোডশেডিং কমিয়ে ভোগান্তি কমানোর সুযোগ সরকারের আছে। তবে ভোগান্তি থেকে একেবারে কবে মুক্তি মিলবে, সেটার সমাধান আপাতত সরকারের হাতেও নেই বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, সম্প্রতি গরম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভাদ্র মাসে এমনিতেই একটা ভ্যাপসা গরম থাকে। এর সঙ্গে সাগরে লঘুচাপ থাকায় আর্দ্রতা একটু বেশিই। এই আর্দ্রতার কারণেই গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। এটি কমতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে।

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টি হতে পারে এই মাসের শেষদিকে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ভারী বৃষ্টি হবে না। ফলে ভ্যাপসা গরম থাকতে পারে সে সময়ও। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গরম থাকবে। অক্টোবরে গিয়ে গরম কমতে পারে বলে জানান তিনি।