রাজধানীসহ দেশের শহর-গ্রাম জুড়ে বৈদ্যুতিক অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার। কিন্তু একটি ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার পর তার শেষ গন্তব্য কোথায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে পরিবেশের জন্য এক ভয়ঙ্কর অদৃশ্য চক্র। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি বদলানোর পর সেটি গ্যারেজ বা দোকান ঘুরে চলে যায় ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীর হাতে। সেখান থেকে ব্যাটারি ভেঙে সিসার অংশ আলাদা করা হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে খোলা জায়গায় সেই সিসা আগুনে বা মাটির গর্তে গলানো হয়। গলনের সময় ধোঁয়া বাতাসে, এসিড ও বর্জ্য মাটি-পানিতে এবং সিসার কণা মানুষের শরীরে পৌঁছে যায়। এতে মারাত্মক শারীরিক সমস্যার মধ্যে পড়েন শিশুরা। ব্যাটারি গলিয়ে বের করা সিসা আবার নতুন ব্যাটারির কাঁচামালে ফিরে আসে। সেই সিসা দিয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করে পুনরায় অটোরিকশাচালকদের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়। এভাবে একই বিষাক্ত ধাতু বারবার অর্থনীতির ভেতর ঘুরে পরিবেশ ও মানুষের শরীরে ঢোকার নতুন পথ তৈরি করছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)’র বাংলাদেশে ব্যবহৃত সিসা-এসিড ব্যাটারি (ইউল্যাব) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ১০০টি সিসা কারখানার তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের ২৭০টি স্থানে এসব কারখানা শনাক্ত করা হয়। এর অধিকাংশই ঢাকা ও এর আশপাশে গড়ে উঠেছে। এসব স্থানের আশপাশে উচ্চমাত্রার সিসা ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে বেসরকারি সংস্থা এসএমইপি গবেষণা তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ই-রিকশা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান বাড়ার সঙ্গে লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ছে। ব্যাটারির সিসা মাটির খোলা গর্তে আগুন দিয়ে গলানো হয়, যাতে সরাসরি মাটিতে সিসা দূষণ ঘটে। অর্থাৎ অটোরিকশার ব্যাটারি শুধু একটি ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ নয় এর শেষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনাই হয়ে উঠছে পরিবেশ দূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
আরও পড়ুন:
বেপরোয়া ‘বাংলার টেসলা’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার ও অটোরিকশা চলছে। প্রতিটি অটোরিকশায় অন্তত ৪টি ১২ ভোল্ট লেড- এসিড ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারি গড়ে ৭ থেকে ১০ মাস ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রতি বছরে কমপক্ষে ২ কোটি ৪০ লাখ বাতিল ব্যাটারি ভাঙাড়ি দোকান থেকে সিসা গলন কারখানা ঘুরে আবার নতুন ব্যাটারি তৈরি হয়ে ইজিবাইক চালকদের কাছে ফিরে আসছে। মাঝপথে এসব বাতিল ব্যাটারি সিসা গলন কারখানায় আগুনে পুড়ে টনের টন ক্ষতিকর সিসা বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে বেশ কয়েকটি গবেষণায় উঠে এসেছে। জাতিসংঘের ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ই-রিকশা থেকে অন্তত ১ লাখ ৬৭ হাজার টন সিসা বর্জ্য তৈরি হয়। এরমধ্যে ৩০ শতাংশ সুরক্ষিতভাবে রিসাইকেল করা হলেও ৭০ শতাংশ অরক্ষিত উপায়ে রিসাইকেল করা হয়। যা মাটি, পানি, বাতাস ও খাবারে মিশে মানুষের শরীরে ঢুকে যায়।
ঢাকার আশপাশের কয়েকটি ব্যাটারি গলন প্লান্টে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একটি অটোরিকশার ব্যাটারি যখন দুর্বল হয়ে যায়, সেটি গ্যারেজ বা ব্যাটারি দোকানে বিক্রি করে দেয়া হয়। পরে পুরনো ব্যাটারি চলে যায় ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীর হাতে। সেখানে ব্যাটারি ভেঙে সিসার অংশ আলাদা করা হয়। এই পর্যায়ে এসিড, সিসার ধুলা ও ব্যাটারির বর্জ্য মাটিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এরপর সিসার অংশ গলিয়ে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ধাতুতে পরিণত করা হয়।
তিন বছর আগে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকায় একটি পুরনো ব্যাটারি থেকে সিসা উৎপাদন কারখানা ছিল। সেখানে প্রতিদিন রাতে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করা হতো। কারখানার ২০০ মিটার দূরে মোসলেহ উদ্দিনের বাড়ি। কথা হলে তিনি জানান, দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করা মোসলেহ উদ্দিন প্রতি রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রবল শ্বাসকষ্টে ভুগতেন। স্বাভাবিকভাবে দম নিতে পারতেন না। মূলত ব্যাটারির চুলা জ্বালানোর পর তার সন্তান অস্বাভাবিক কান্না করতেন। পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধে ঘুমাতে পারতেন না এই পরিবারসহ আশপাশের অনেকে। পরে এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই ব্যাটারি কারখানা ভেঙে দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ২০২৩ সালের ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু কারখানার পাশের ঘরবাড়ির দেওয়ালের পলেস্তারা নষ্ট হয়ে গেছে। ওখানের মাটিতে কিছু চাষ করলে হয় না। এখনো পরিবেশে সিসার দূষণ রয়ে যায়। গবেষকরা ওই এলাকার শিশুদের সিসার সংস্পর্শ এবং মাটির দূষণ পরীক্ষা করেন। গবেষণাটি দেখায়, ব্যাটারি গলনের ফলে ছড়িয়ে পড়া সিসা শুধু কেন্দ্রের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; আশপাশের পরিবেশও দূষিত করেছিল। কারখানা বন্ধ হলেও এখনো সেখানে মাটিতে সিসার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকায় একটি ব্যাটারি কারখানায় কাজ করেন রবিউল ইসলাম। তিনি ৪ বছর ধরে ব্যাটারি পোড়ানোর কাজে যুক্ত আছেন। তার পুরো শরীরে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন। কথা হলে তিনি বলেন, পুরনো ব্যাটারি জড়ো করে রাতে আগুন দেয়া হয়। তখন আশপাশে টেকা যায় না। স্বাভাবিক দম নেয়া যায় না। প্রচুর শ্বাসকষ্ট হয়। গলনের সময় কোনো মাস্ক অথবা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। ব্যাটারি গলিয়ে সিসা বের করে তা কেজি দরে আবার নতুন ব্যাটারি তৈরি করা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। আমি আগে সুস্থ ছিলাম। এই কাজে এসে অসুস্থ হয়ে গেছি।
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অটোরিকশা চালান সিরাজ উদ্দিন। মাত্র ৮ মাস আগে কেনা অটোরিকশার দুটি ব্যাটারি অকেজো হয়ে যায়। পরে বাতিল হওয়া ব্যাটারি ঢাকা উদ্যানে একটি ভাঙাড়ি দোকানি ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। বাতিল ব্যাটারি কেনা দোকানি আলম হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি প্রতি মাসে অন্তত শতাধিক পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে আমিন বাজারের একটি ব্যাটারি পোড়ানো কারখানার কাছে বিক্রি করেন। এই দোকানির কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আমিন বাজারে ব্যাটারি গলন কারখানায় গেলে সেখানে শত শত পুরাতন বাতিল ব্যাটারি স্তূপ দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে কাজ করা শ্রমিক হোসেন আলী বলেন, আমরা পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে রাতে গলিয়ে সিসা বের করি। পরে যাত্রাবাড়ীর নতুন ব্যাটারি তৈরির কারাখানার লোকজন এসে কেজি দরে এসব সিসা কিনে নেন। পরে তারা ওই সিসা দিয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সিসা-দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। দেশে কোটি কোটি শিশু উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর পরিণতি গুরুতর এবং অনেক ক্ষেত্রেই অপরিবর্তনীয়। এর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া এবং সারা জীবনের শেখার সক্ষমতায় ঘাটতি। অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিপুল। শিশুদের সম্ভাবনা কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতায় দেশকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ জুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে একটি আন্দোলন এই বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তারা দূষিত স্থানগুলো নথিভুক্ত করছে এবং এমন একটি ন্যায্য রূপান্তরের দাবি জানাচ্ছে। যেখানে মানুষের জীবিকা ও জনস্বাস্থ্য দুটিই সুরক্ষিত থাকবে। এই প্রচেষ্টায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল এবং পিউর আর্থ বাংলাদেশ সহযোগিতা করছে। ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, এই সংকট আরও গভীর একটি শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, সিসা বিষক্রিয়া নীরবে বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে। এটি মানবসম্পদ, শিক্ষা ও উন্নয়নকে প্রভাবিত করা একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা। আরেকটি প্রজন্ম স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যেকোনো পরিবর্তন হতে হবে ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ন্যায্য রূপান্তরের অর্থ হলো, একটি সংকটের সমাধান করা।
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা প্রফেসর আহমেদ কারুজ্জামান মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, কিছু ব্যাটারি মাত্র ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। সেগুলো অসাধু চক্রের মাধ্যমে অবৈধ সিসা গলন কারখানায় চলে যায়। পরে পরিবেশ, মাটি, পানি, বাতাসে শত শত টন সিসা ছড়িয়ে দিয়ে আবার ব্যাটারি হয়ে দোকানে ফিরে আসে। এতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এখনই এই ঝুঁকিপূর্ণ রিসাইকেল প্রক্রিয়া বন্ধ করতে না পারলে বিপর্যয় ঘটতে পারে।