Image description

রাজধানীর খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী। বর্তমানে জামিনে তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ভাটারা থানার একটি মাদক মামলার আসামি রবিউল হক মিয়া। তিনি সম্পর্কে রাব্বির মামা।

জামিনে থাকা এই দুই আসামিকে মামলা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে রাব্বির স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পার সঙ্গে আদালতপাড়ায় একটি চক্রের পরিচয় হয়। চক্রটি বিচারকের ভুয়া সিল তৈরি করে জাল আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

আদালত ও ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, রাব্বী ও তার মামা রবিউলকে মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেয় চক্রটি। বিনিময়ে রাব্বীর স্ত্রী অর্পার কাছ থেকে টাকা নেন চক্রের সদস্য আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে ‘মুরগি রাসেল’। অস্ত্র মামলার জন্য নেওয়া হয় ৪০ হাজার টাকা। মাদক মামলার জন্য ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় জালিয়াতি। অস্ত্র মামলা বিচারাধীন থাকা ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করা হয়। একইভাবে মাদক মামলা বিচারাধীন থাকা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতের বিচারকের সিল ও স্বাক্ষরও জাল করা হয়।

পরে তৈরি করা হয় দুই আসামির অব্যাহতির জাল জুডিসিয়াল নথি। অব্যাহতির আদেশের কপি অর্পার হাতে তুলে দেন ‘মুরগি রাসেল’। এখানেই শেষ হতে পারত প্রতারণার ঘটনা।

কিন্তু বিপত্তি বাধে মামলার পরবর্তী তারিখে আসামিদের হাজির হওয়ার নোটিশ যাওয়ার পর। কোর্ট স্টাফদের ম্যানেজ করা হয়নি। তাই রাব্বীর স্ত্রী অর্পার বাসায় হাজিরার নোটিশ পৌঁছে যায়।

অর্পা আদালতে গিয়ে খোঁজ নেন। তখন তিনি জানতে পারেন, অব্যাহতির আদেশটি ভুয়া। মামলা দুটি এখনো চলমান। এরপর টাকা ফেরত দিতে ‘মুরগি রাসেলকে’ চাপ দিতে থাকেন অর্পা। তখনই মামলা দুটি চিরতরে গায়েব করার পরিকল্পনা করেন রাসেল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২ জুলাই দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে যান রাসেল। মুখে ছিল মাস্ক। নিজেকে আইনজীবীর মুহুরি পরিচয় দিয়ে তিনি খিলগাঁও থানার রাব্বীর অস্ত্র মামলার নথি দেখতে চান।

ওই আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান ওরফে রনির কাছ থেকে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে নথিটি নেন তিনি। পরে দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে বিচারক নাজমুলকে পাশের খাস কামরায় ডেকে পাঠান। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে তিনি রাসেলকে আর দেখতে পাননি। পাওয়া যায়নি মামলার নথিটিও।

এ ঘটনায় ওই দিনই আদালতের বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম কোতোয়ালি থানায় নথি চুরির মামলা করেন।

এক মাস পর আবারও একই কাণ্ড ঘটান রাসেল। গত ৩ আগস্ট তিনি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতে যান। উমেদার হিমেলকে ১ হাজার টাকা দিয়ে রবিউলের মাদক মামলার নথি দেখতে চান। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, হিমেলের আসল নাম সাদ্দাম।

পরে উমেদার অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে নথি নিয়ে পালিয়ে যান রাসেল। এ ঘটনায় আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

তদন্তে নতুন মোড় আসে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে। পুলিশ দেখতে পায়, পৃথক দুই মামলার নথি চুরি করা ব্যক্তি একই। এরপর দুই মামলার আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। তখন জানা যায়, দুই মামলার আসামি রাব্বী ও রবিউল সম্পর্কে মামা-ভাগনে।

কোতোয়ালি থানার ওসি কে এম রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে শুরু হয় অভিযান। দফায় দফায় মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। আইনজীবীদের সহায়তায় নথি চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে পুলিশ।

গত ২১ আগস্ট রাজধানীর শ্যামপুর থানার একতা হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ‘মুরগি রাসেলকে’।

জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল জানান, চুরি করা মামলার নথি রাব্বীর স্ত্রী অর্পার বাসায় রয়েছে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুগদা থানার মুড়াওয়ালী গলিতে অর্পার বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে অর্পাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় চুরি যাওয়া দুই মামলার নথি।

জাল বিচারিক নথি ও বিচারকের ভুয়া সিল তৈরিতে সহযোগিতার অভিযোগে সিএমএম আদালতের পাশে আহসান হাবীবের একটি দোকানের তথ্যও দেন রাসেল। পরে গত রোববার আদালতপাড়ায় অভিযান চালিয়ে আহসান হাবীবকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতে কোতোয়ালি থানার সাধারণ নিবন্ধন শাখার এসআই কামাল হোসেন জানান, গত ২১ আগস্ট রাসেল ও অর্পাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন আদালত। রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই গতকাল সোমবার অর্পা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া একই মামলায় গতকাল কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। রাসেল এখনো রিমান্ডে রয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই দেবাশীষ হাওলাদার কালবেলাকে বলেন, ‘ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর। আমাদের অনুসন্ধান চলছে। এরই মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আর কে কে জড়িত, তা আমরা তদন্ত করছি।’