Image description
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার প্যাকেজ, খেলাপি ঋণের লাগামহীন চাপ এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি। এর বাইরে রয়েছে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও আমানত সংকট। এর মধ্যেই মুদ্রানীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। কমিটির মতে, শুধু সুদের হার নয়; ব্যাংক খাতের গভীরে থাকা শাসন, জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে এ চিত্র। যুগান্তরের হাতে থাকা বৈঠকের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু নীতি সুদহার কমানো বা বাড়ানোর আলোচনাই করেননি তারা; বরং ঋণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছেন, খেলাপি ঋণ কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের দেওয়া প্রণোদনার অর্থ কার পকেটে যাচ্ছে, প্রকৃত সুফল উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন কি না-এসব প্রশ্নকেই সামনে এনেছেন কমিটির সদস্যরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।

কার্যবিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই এবং রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এ প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিপুল অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার হাতে যাচ্ছে কি না-তা কঠোরভাবে তদারকির জন্য বলেছেন তারা।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা দুর্বলতা নিয়ে সদস্যরা সরাসরি প্রশ্ন, সমালোচনা ও একাধিক সুপারিশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি থেকে শুরু করে খেলাপি ঋণ, ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি, ইসলামি ব্যাংকিং, বিশেষ অডিট, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা এবং সুদের হার-প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই বাড়তি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন সংসদ-সদস্যরা।

বৈঠকে খেলাপি ঋণ নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সংসদীয় কমিটি। তারা খেলাপি ঋণের দায় কার-এমন প্রশ্নও তুলেছেন। কমিটির সদস্যরা খেলাপি ঋণ আদায়ে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি তৈরির ক্ষেত্রে শুধু ঋণগ্রহীতাই নয়, ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেন। কমিটি বলেছে, খেলাপি ঋণ কি শুধু ব্যবসায়ীর ব্যর্থতার ফল, নাকি ঋণ অনুমোদন ও ব্যাংক পরিচালনার ভেতরেও এর দায় রয়েছে? কমিটি এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

যদিও এ সময় বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মন্দ ঋণ বাড়তে থাকায় অনেক ব্যাংকে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

৯ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নয়-সুদহার নিয়ে চাপ : কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী বৈঠকে একাধিক সদস্য উচ্চ সুদহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উচ্চ সুদহারকে বড় বাধা হিসাবে তুলে ধরে দ্রুত নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা। এমনকি নীতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়টিও এ সময় আলোচনায় আসে। জানা গেছে, এর মাত্র কয়েকদিন পরই বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে। ফলে সংসদীয় কমিটির আলোচনার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারে পরিবর্তন আসে। তবে কমিটির আলোচনায় শুধু সুদহার কমানোর দাবি ছিল না; পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয়তার সুপারিশও উঠে আসে।

জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, শুধু উচ্চ সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ।

মুদ্রানীতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় : বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে বৈঠকে এটিও স্পষ্ট করা হয়, মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদানির্ভর নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বাজারের প্রতিবন্ধকতা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় সংসদীয় কমিটি মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করে।

একসঙ্গে কঠোর মুদ্রানীতি ও প্রণোদনার মধ্যে বিরোধ কোথায় : একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা-এই দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় কতটা হচ্ছে, এমন প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে কমিটির বৈঠকে। কমিটি বলেছে, অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত কড়াকড়ি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করার লক্ষ্য স্থির করার জন্য সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

হাই পাওয়ার্ড মানি নিয়ে প্রশ্ন : কমিটির একজন সদস্য বৈঠকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থায়ন এবং অর্থ সরবরাহের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনার ফলে অর্থ সরবরাহ কতটা বাড়বে, মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব কী এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর প্রকৃত অবদান কতটা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রণোদনার অর্থ যদি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে না গিয়ে অন্য খাতে প্রবাহিত হয়, তাহলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফলের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

ইসলামি ব্যাংকিং নিয়েও উদ্বেগ : বৈঠকে ইসলামি ব্যাংকিং খাত নিয়েও একাধিক সুপারিশ এসেছে। কার্যবিবরণীতে ইসলামি ব্যাংকিংকে মুদ্রানীতিতে আরও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকগুলোর অতীতের অনিয়ম, শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতে কমপ্লায়েন্স ও ডিউ ডিলিজেন্স জোরদারের জন্য সুপারিশ করে কমিটি।

বিশেষ অডিটের প্রস্তাব : ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু নিয়মিত পরিদর্শন যথেষ্ট নয় বলে মনে করে কমিটি। কয়েকটি ব্যাংকে পরিচালনার বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় তারা বিশেষ অডিটের প্রস্তাব দেন। অতীতের গোপন রাখা সমস্যা প্রকাশ্যে এনে ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান নিরূপণের সুপারিশ করেন তারা। কমিটির মতে, এটা না হলে কাগজে-কলমে একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এবং বাস্তব সম্পদমানের মধ্যে পার্থক্য থাকলে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে।

ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ব্যবস্থাপনায় নতুন নজর : কমিটি খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে সুপারিশ করে। বিশেষ করে ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। কমিটির মতে, প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে সেই ঋণের সুবিধা কে নিয়েছেন, সেটি শনাক্ত করা জরুরি। এতে খেলাপি ঋণ কমে আসবে।

মুদ্র্র্রানীতি পর্যালোচনার সময়সীমা : কমিটির পক্ষ থেকে ছয় মাস অন্তর পর্যালোচনার বদলে তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার জন্য বলা হয়।

সংসদীয় কমিটির নজরদারি বাড়ছে : প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে-বাংলাদেশ ব্যাংক ও মুদ্রানীতি এখন সংসদীয় নজরদারির আরও ঘনিষ্ঠ পরিধিতে আসছে। কমিটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মুদ্রানীতি বিষয়ে তুলনামূলক তথ্য, বিবরণী ও বিস্তারিত কার্যপত্র চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, মো. জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, মো. শাহাদাত হোসেন, মো. সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং মো. আবুল হাসনাত অংশ নেন।