চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া আগের ঋণ পরিশোধ করেছে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের আয়ের সক্ষমতার তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি বলেই বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার নতুন বেতনকাঠামোও চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। যদিও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তেমন পদক্ষেপ নেই। ফলে সামনে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণের ব্যয়ও বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে সরকারি ট্রেজারি বিলের চারটি নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে মোট ৪৪ হাজার কোটি টাকা তোলা হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি। বিপরীতে একই মেয়াদি বিলের ৩৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে ট্রেজারি বিল থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে ২ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের তিনটি নিলামের মাধ্যমে সরকার জুলাইয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে পরিশোধ করেছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে বন্ডে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিল ও বন্ড মিলিয়ে মোট নিট ঋণ ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অপর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও এর বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।
ব্যাংকাররা বলছেন, এই মুহূর্তে অনেক ব্যাংকেই অলস টাকা পড়ে আছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেই। তাই ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়িয়ে শুধু সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ানো অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক নয়। ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। চাহিদা বাড়লেই ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে।
সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়েও ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি ঋণ নেয় সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের সঙ্গে বাড়ছে সুদের ব্যয়ও। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ঋণের জোগান দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। তবে এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেটি সরকারকেই ভাবতে হবে। রাজস্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী না আসায় ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, অর্থবছরের প্রথম মাসে সরকারের ব্যয়ের চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। ফলে সরকার বেশি ঋণ নেয়। এখানে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলেও বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা ইতিবাচক। তবে অর্থনীতির গতি বাড়াতে হলে অবশ্যই ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।