Image description

জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতার পথে এগোতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী তিন বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সরকারি নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণে বড় পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি গ্যাস, এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তিন বছরে বড় সক্ষমতা : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানি করা জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সাম্প্রতিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আগামী তিন বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এই লক্ষ্যে বড় আকারের গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নথিতে নগরাঞ্চলে নির্দিষ্ট স্থানে ৭০ মেগাওয়াট এবং ন্যূনতম ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সহজ হচ্ছে নেট মিটারিং

সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নেট মিটারিং সম্প্রসারণ। সরকারি নথিতে নতুন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিদ্যমান প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি নেট মিটারিং সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ে।

নেট মিটারিং সহজ হলে গ্রাহক নিজস্ব ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় এই ব্যবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সরকারি ভবনের ছাদে বেসরকারি বিনিয়োগ

সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ভবনে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কমবে জ্বালানি আমদানির চাপ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনো তুলনামূলক কম। ফলে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা গেলে বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি মিশ্রণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, এলএনজি, তেল বা কয়লার প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এসব জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হলে জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে।

রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিং বাড়লে দিনের বেলা গ্রিডের ওপর চাপও কিছুটা কমবে; বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে প্রচলিত বিদ্যুতের চাহিদার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিনিয়োগের নতুন বাজার

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রকৌশল ও নির্মাণ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

তবে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জনের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন, জমি নির্বাচন, অর্থায়ন, গ্রিড সংযোগ ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নেট মিটারিংয়ের বিদ্যমান জটিলতা পুরোপুরি দূর করতে হবে।

বাস্তবায়নে চার দফা পরামর্শ সিপিডির

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী তিন বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে লক্ষ্য অর্জনে এখনই সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি রিভিউ ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদন, জমি, গ্রিড সংযোগ, নেট মিটারিং, বিদ্যুৎ ক্রয়সহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাগত বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সার্কুলার জারি করতে হবে।’

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, ‘পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ একটি বড় বিনিয়োগ কর্মসূচি। তাই ব্যাংকার, ফাইন্যান্সার, বিনিয়োগকারী, ইপিসি এবং আরইএসসিও প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

দ্রুত নেট মিটারিং চান বিজিএমইএ সভাপতি

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেট মিটারিং ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচক ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আবেদন অনুমোদন, সংযোগ এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘নেট মিটারিংয়ের সুযোগ যত সহজ ও দ্রুত করা যাবে, শিল্প-কারখানাগুলো তত বেশি রুফটপ সোলারে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে একদিকে শিল্পের বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।’

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে। তত দিন পর্যন্ত বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র চালু রাখতে হবে। শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখতে একটি নির্ভরযোগ্য ট্রানজিশন পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

সরকারের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি হবে না; বরং জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন আসবে।