Image description

রংপুর শহরের একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও ২ সন্তানসহ চারজনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাসায় এ ঘটনা ঘটে। পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পুলিশ বলছে, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী দাবি করেন, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। তার ধারণা, সেই বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। নিহতরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)। ঘরের ভিতরে এই ফোর মার্ডারের প্রতিবাদ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে জেলা স্কুলসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পুলিশ জানিয়েছে, স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বাসাটি বেশ কিছুদিন ধরে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। দীর্ঘসময় কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ আসায় স্থানীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে তালা ভেঙে ঘরের ভেতর থেকে ৪ জনের লাশ উদ্ধার করে।
নিহতদের মধ্যে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের লাশ দোতলার ছাদ, সিঁড়ি থেকে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা এবং ঘরের খাটের নিচ থেকে কারমাইকেল কলেজ থেকে সদ্য মাস্টার্স পাস করা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী, পুত্র রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর যান। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার নিজ গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়ায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা স্বীকারোক্তি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত দল ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু (আলামত) সংগ্রহ করে, যা অপরাধীদের শনাক্ত করতে সরাসরি সাহায্য করেছে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের স্পষ্ট আলামত পায় পুলিশ। এ ছাড়া খুনিরা ঘরে থাকা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল এবং সেখানে খেজুরের বিচিও ফেলে যায়। খেজুরের বিচি ও কামড়ানো অর্ধেক শসা ফেলে যায় তারা। আবার ঘর তল্লাশির সময় আগুন দিয়ে টেস্ট করা বা পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি পাওয়া যায়। এটি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় ঘটনার সঙ্গে স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ স্থানীয় কেউ জড়িত আছে।

পুলিশ বলছে, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনও বিরোধ ছিল না। অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে ওই বাসার ছাদে আসে। এই দুজন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশের ভাষ্যমতে, আসামিরা জানিয়েছে- প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যা করতে তাদের চার-পাঁচ মিনিট সময় লাগে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরেছিলেন। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেছেন।

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। এরপর জুম্মার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওই স্বর্ণালকার নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে। অভিযুক্তদের দেখানো মতে সেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

এর আগে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাড়িটির বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পারিপার্শ্বিকতা ও ভেতরের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে আমার মনে হয়েছে, এটি ডাকাতির ঘটনা হতে পারে। যেসব আসবাব ও জায়গায় সাধারণত টাকা-পয়সা বা গয়না রাখা হয়, সেগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে তদন্ত না করে এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

তবে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী দাবি করেন, বাড়ির নির্মাণ কাজ চলার সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটি ঝামেলা হয়েছিল। তার ধারণা, সেই বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘বাড়ি করার সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটা ঝামেলা ছিল। এরপর তারা বাড়িতে বসবাস করছিলেন। বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করে ঘটনাটিকে অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই।’

গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান, গণপতির শ্যালকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, পরিবারের চার সদস্যের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এ ছাড়া বাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলছিল এবং ভেতরে ছিল অন্ধকার। পরে স্থানীয় এক যুবককে বাড়িতে খোঁজ নিতে পাঠানো হয়। তবে তিনি সেখানে পৌঁছানোর আগেই স্বজনেরা বাড়িতে গিয়ে লাশ দেখতে পান।

সরেজমিনে মাছুয়াপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। বাড়ির নিচতলায় কাজ চলছিল। ওপরের তলার নির্মাণকাজ শেষ করে সেখানেই পরিবারটি বসবাস করতো। চার জনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাড়ির সামনে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ভিড় দেখা যায়।
পাশের বাড়ির গৃহবধূ সোনালী দাস বলেন, ‘খুব ভালো পরিবার ছিল। সবার সঙ্গে মিশতো, কথা বলতো। কারা যে তাদের এমন নৃশংসভাবে হত্যা করলো, জানি না। পরিবারে শত্রুতা ছিল, নাকি বাইরের কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল, তা তদন্তেই জানা যাবে।’