ঘটনা গত ১৭ই আগস্ট ভোরের। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে একটি বাড়ি পুড়ে ছাই। আড়ালে অনেক রহস্য। বিরোধের ধারাবাহিকতা আছে। প্রশাসনও সেটি জানে। একটি মামলার বাদীও প্রশাসন। তবুও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬ দিনেও মামলা রেকর্ড করেনি পুলিশ। এ নিয়ে রহস্যের অন্ত নেই। কেন মামলা হচ্ছে না- এ প্রশ্ন সর্বত্রই। ঘটনাস্থল গোলাপগঞ্জ উপজেলার আমুরা ইউনিয়নের ধারাবহর গ্রামে। টিলা, জলাভূমির মিশ্রণে প্রকৃতির নয়নাভিরাম একটি এলাকা। এই গ্রামেই বাড়ি সৌদি প্রবাসী মুক্তা ও শ্রমিক দল নেতা মান্নার।
পিতৃ সম্পত্তিতে বংশ পরম্পরায় তারা বসবাস করছেন। ঘটনার দিন ভোরে মান্নার বাড়িতে আগুন দেখেন স্থানীয়রা। তাৎক্ষণিক তারা গিয়ে বাড়িতে থাকা পরিবারের সদস্যদের বের করে আনেন। এতে রক্ষা পায় প্রাণ। তবে মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে কয়েক কক্ষবিশিষ্ট ওই বাড়ি পুড়ে ছাই। নিঃস্ব হয়ে গেছে একটি পরিবার। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন- ফায়ার সার্ভিস আসতে বেশি দেরি করেনি। তবু ঘরের কোনো আসবাবপত্র রক্ষা করা যায়নি। দ্রুতই আগুন ছড়ায় এবং আধা ঘণ্টার মধ্যে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারা প্রশ্ন তুলে বলেন, কেবলমাত্র পরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ডে এমনটি হতে পারে। খবর পেয়ে সকালে ওই বাড়িতে ছুটে যান সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী। সঙ্গে যান থানার ওসি সবেদ আলী সহ অন্যরা।
ঘটনার দু’দিনের মাথায় বুধবার সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন মুক্তা আহমদ। ভাই আসার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় থানায় এজাহার দেন মান্না আহমদ। সেখানে তিনি বাড়ির পার্শ্ববর্তী লেকভিউ হাউজিংয়ের স্বত্বাধিকারী শরীফ উদ্দিন সহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। মান্নার দাবি- লেকভিউ মালিক শরীফ উদ্দিন ও তার লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান জালাল উদ্দিন তাকে প্রায় সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। ঘটনার দিন ভোরে তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে আগুন দিয়েছেন। এ সময় তাকে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন।
এদিকে, এ ঘটনায় থানায় এজাহার দেয়ার পর মূল নাটকীয়তা শুরু হয়। পুলিশ বিষয়টিকে রহস্যময় করে তুলেছে। এজাহারে থাকা আসামিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারা এজাহারটি মামলায় রেকর্ড করছে না। এ কারণে পুলিশের একপেশে আচরণেরও অভিযোগ তুলেছেন মান্নাসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। গোলাপগঞ্জ থানার ওসি সবেদ আলী জানিয়েছেন, মামলার বাদীর ঘটনার দিনের বক্তব্যের সঙ্গে এজাহারের বক্তব্যে মিল নেই। এজন্য মূল আসামি শনাক্ত ও রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ মামলার রেকর্ডের আগে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অনুসন্ধানের পর মামলা রেকর্ড হবে বলে জানান তিনি। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে ওয়াকিবহাল। তিনি ঘটনার দিনই আগুনে পোড়া বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে করেছেন সহায়তাও। এমপি এমরান মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মামলা রেকর্ডের জন্য পুলিশকে বলা হয়েছে। ‘এ ঘটনায় মামলা রেকর্ড হবেই’- অনেকটা জোর দিয়ে এ কথা জানান তিনি। বলেন- এজাহারের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করছে। তারা তদন্ত করুক। তবে মামলা রেকর্ড করার জন্য কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ধারাবহর গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে গতকাল কথা হয় মানবজমিনের। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে অনেকেই বক্তব্য দিতে চান না। বুঝা যাচ্ছিলো দমবন্ধ একটি পরিবেশ আছে। প্রভাব বিস্তার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজের কারণে পরিবেশ ঘোলাটেও। নিরাপত্তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। এর পেছনের কারণও একাধিক। দক্ষিণ বাঘা এলাকার লন্ডন প্রবাসী শরীফ উদ্দিন নিজ এলাকা থেকে অনেক দূরের জনপদ ধারবহরে লেকসিটি হাউজিং গড়ে তুলেছেন। ন
য়নাভিরাম এলাকা হওয়ার কারণে এখানে হাউজিং ব্যবসা খুবই রমরমা। তিনি এখানে এসে এই ব্যবসা শুরু করেন। তবে হাউজিংয়ে ওই এলাকায় বাধা প্রকৃতি। হাউজিং করতে হলে ধ্বংস করতে হবে পরিবেশ। পাহাড় ও টিলা কাটা, জলাশয় ভরাট করা যা করার সবই করা হয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ নাখোশ। এই প্রজেক্টের লাগোয়া বাড়ি হচ্ছে শ্রমিকদলের মান্নার। নানা সময় পাহাড়, টিলা কাটা ও জলাশয় ভরাট নিয়ে মান্নার সঙ্গে তার বিরোধ হয়েছে। হাউজিংয়ের জমির মূল মালিক গ্রামের হাফিজ আল মাহমুদ চৌধুরী। জমি বিক্রির টাকা পরিশোধসহ নানা ঘটনায় শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে আল মাহমুদের বিরোধ রয়েছে। তবে তাদের দু’জনের বিরোধের ঘটনার সঙ্গে মান্না ও তার পরিবারের সম্পৃক্ততা নেই। জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আল মাহমুদ চৌধুরী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে তিনটি মামলা করেছেন। এসব মামলায় পাশের বাড়ি হওয়ার কারণে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মান্না সাক্ষী হয়েছেন। পাহাড় ও টিলা কাটার ঘটনায় সৌদি আরবে থাকা মান্নার ভাই মুক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন। সর্বশেষ শরীফ উদ্দিনের পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সৌদি আরবে থেকেও সোচ্চার ছিলেন মুক্তা। এদিকে মান্নার বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশে থাকা শরীফ উদ্দিন গোলাপগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করে আল মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাকে আসামি করার পাঁয়তারা চলছে। তার এই অভিযোগের বিরুদ্ধে শনিবার সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করেন হাফিজ আল মাহমুদ চৌধুরী। তিনি হাউজিং করার সময় প্রতারণা, জমি দখলসহ নানা অভিযোগ করেন। শরীফকে তিনি ভূমিখেকো হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তার দ্বারা সবই সম্ভব বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শরীফ উদ্দিন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন- ওই দিন তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। মান্না বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষী ছিলেন সত্য। তবে এই বিরোধের জেরে তিনি বা তার লোকজন বাড়িতে আগুন দেবে সে মানসিকতা তিনি পোষণ করেন না। পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত করলে সত্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান তিনি। এদিকে সৌদি ফেরত মুক্তা আহমদ জানিয়েছেন- ঘটনার পর শরীফ উদ্দিন ও লোকজন আশপাশের পরিবেশ এমন করে তুলেছিল যে, তাদের নাম মুখে আনতেও তার ভাই ভয় পান। যখন তিনি সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন এবং সবাই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এতে অভয় পেয়ে দু’দিন পর মূল অভিযুক্ত শরীফ উদ্দিন ও তার লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান জালাল উদ্দিনকে অভিযুক্ত করে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। এজাহারে শরীফের নাম দেয়ায় বর্তমানে তারা হুমকির মুখে রয়েছেন বলে দাবি করেন এই প্রবাসী।