রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গতকাল রাতে হত্যার তদন্ত শুরু করে ভোরেই আসামিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের সকল ঘটনা। জানানো হয়, প্রত্যেকের গলায় গামছা পেঁচিয়ে একের পর এক হত্যা করা হয়। শিশু প্রিয়মকে হত্যার পরিকল্পনা না থাকলেও হত্যাকারীদের চিনে ফেলার শঙ্কায় তাকেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর গোসল করে ডাইনিং টেবিলে এসে খেজুর, শসা খাওয়ার পর ইয়াবা সেবন করে হত্যাকারীরা। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) কে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় পুলিশ।
ইয়াবাসেবী মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ: যুবক সিদ্ধার্থ দাস ৮ বছর ধরে রংপুর নগরীর পিকে পাল জুয়েলার্সে স্বর্ণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছিল। অপরদিকে মুগ্ধ দাস সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করতো। সিদ্ধার্থের সঙ্গে মুগ্ধের সম্পর্ক মামাতো ভাই। তারা দু’জন মাছুয়াপাড়ার প্রশান্ত নামে ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকা পিস দরে ইয়াবা কিনে সেবন করতো। তারা বেশির ভাগ সময় মাদক সেবনের জন্য নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে পছন্দ করতো। হত্যাকাণ্ডের দিন প্রতিবেশী সীমান্তদের বাড়িতে গিয়ে ইয়াবা সেবন করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করে তারা।
ইয়াবা সেবন থেকে ৪ হত্যাকাণ্ড: শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পার্শ্ববর্তী ভবন দেবু দাসের। সেই ভবন দিয়ে বৃহস্পতিবার ভোররাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ শিক্ষক গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে আসে। সেখানে বসে ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে শব্দ পেয়ে ছাদে আসেন শিক্ষক গণপতি। তিনি ঘাড়ে গামছা নিয়ে ছাদে আসেন। তাদের দেখে ইয়াবা সেবনের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাৎক্ষণিক গণপতির ঘাড়ের গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হত্যার সময় শিক্ষক গণপতি আওয়াজ করলে স্ত্রী প্রীতিলতা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ওত পেতে থাকা মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ সিঁড়িতেই ওই গামছা প্রীতিলতার গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করে। প্রীতিলতার চিৎকারে সিঁড়ির দিকে মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে তাকেও গলায় গামছা পেঁছিয়ে হত্যার চেষ্টা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এতেও সে মারা না গেলে রশি এনে তার গলায় ও মুখে পেঁচিয়ে জোরে টান দেয়। এতে আগামীর মুখের চোয়াল ভেঙে যায়। প্রায় ৫ মিনিট চেষ্টা করে হত্যা করা হয় আগামীকে। এরপর শিশু প্রিয়মের ঘরে এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। চিনে ফেলতে পারে এমন শঙ্কায় প্রিয়মকে ঘুমন্ত অস্থায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর খেজুর, শসা খায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ: সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, খুনের পর উত্তেজিত ছিল মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর কিছুক্ষণ পর তারা শান্ত হলে প্রিয়মের বাথরুমে প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে। এরপর মুগ্ধ গোসল করে তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে। সেখানে একটি বয়ামে থাকা খেজুর খায় তারা। এরপর ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খাওয়ার পর দু’জন সেখানে ইয়াবা সেবন করে। সকাল হয়ে গেলে তারা পালানোর পরিকল্পনা করতে থাকে। জুমার দিন হওয়ায় নামাজের সময় শিক্ষক গণপতির বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। ঘটনাকে ডাকাতি বলে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র তছনছ করে মেঝেতে ফেলে রাখে। আলমারির ড্রয়ার ভেঙে সেখান থেকে স্বর্ণালংকার নেয় তারা।
যেভাবে শনাক্ত হয় হত্যাকারীরা: শনিরাত রাত থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশ, পিবিআই, সিআইডি’র টিম ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের শনাক্তে কাজ শুরু করে। ঘটনার ৯ ঘণ্টার মধ্যে রোববার ভোরে পুলিশ মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর ডাইনিং টেবিলে ফেলে রাখা খেজুরের বীজ, অর্ধেক খাওয়া শসার টুকরোর ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ চুড়িতে আগুনের তাপ দিয়ে তা স্বর্ণের কিনা পরীক্ষা করে। এতে পুলিশ বুঝতে পারে হত্যাকারীর স্বর্ণালংকার প্রস্তুতের অভিজ্ঞতা রয়েছে। টেবিলে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়ায় পুলিশ ধারণা করে হত্যাকারী মাদকসেবী। এসব ক্লু নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে।
যা বললেন পুলিশ কমিশনার: রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি স্যারের ছাদে বসে নেশা করতে দেখে ফেলার কারণে গণপতি স্যারসহ একে একে তার পরিবারের ৪ সদস্যকে হত্যা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। প্রিয়ম যেহেতু খুনীদের চেনে, তাই তাকেও হত্যা করেছে তারা। এ ঘটনায় মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারসহ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছি। এজন্য সকল সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আসামিদের বিচারের আওতায় আনতে দ্রুত চার্জশিট প্রদান করার কথা জানান পুলিশ কমিশনার।
হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন: একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন। রোববার দুপুরে জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন-সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- শিক্ষার্থী আবির হোসেন, অর্ণব রায়, মাজেদুল ইসলামসহ অন্যরা। এ সময় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিসহ নগরবাসীর নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আগামীর প্রেমিকের আবেগঘন পোস্ট: আগামী চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন প্রেমিক অদিত কার। দু’জনের হাতে হাত ধরে তোলা একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল। এটা বুধবারের ছবি। খুব করে বললো সেদিন আমরা তো কখনো কাপল পিক তুলি নাই। চলো আজকে তুলি। চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।
উল্লেখ্য, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে তার স্বজনরা সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশে খবর দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বাড়ির তালা ভেঙে চিলেকোঠায় গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), সিঁড়িতে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও দোতলায় শোবার ঘরে রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)’র লাশ দেখতে পায় পুলিশ। এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রংপুরসহ দেশ জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।