Image description

দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬-এ ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর গঠিত কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটি। এর মধ্যে অন্যতম ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি বিকৃত করা। এছাড়া পিয়ার ও বক্স গার্ডারে ফাটল, ট্র্যাক ও ভূমি বসে যাওয়া, অতিরিক্ত কম্পন, ট্রেনের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার বিভিন্ন ঘাটতিও পাওয়া গেছে।

কমিটির মূল্যায়নে এগুলো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণজনিত ত্রুটি নয়। বরং নকশার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, তৃতীয় পক্ষের যাচাই, নির্মাণের মান নিয়ন্ত্রণ, গতিশীল কার্যক্ষমতা পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতি এবং পরিচালন নির্ভরযোগ্যতায় বিস্তৃত দুর্বলতার ইঙ্গিত। কয়েকটি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বা আন্তর্জাতিক তৃতীয় পক্ষের যাচাই শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে জরুরি ব্যবস্থা নিতে বলেছে কমিটি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এবং কারিগরি কমিটির সদস্য ড. সামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, এমআরটি-৬ প্রকল্পে ৯টি ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো সমাধানে করণীয়ও বলা হয়েছে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে মেট্রোরেলের গতি কমানো হয়েছে। এতে মেট্রোরেলের কর্মক্ষমতা কমেছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত জাপানি প্রতিনিধিরা কমিটিকে জানিয়েছেন, তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত উদ্বোধনের তাগিদের কারণে কিছু পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বাদ দেওয়া হয়েছিল। তার মতে, সরকারের চাহিদার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয় বাদ দেওয়া পেশাদার সিদ্ধান্ত ছিল না।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন হাসান যুগান্তরকে বলেন, জাপানিজ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে সরকার দেশীয়ভাবে কোনো কারিগরি তদারকি করেনি। তার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। অত্যন্ত জরুরি কারিগরি ইস্যু বাদ দিয়ে জাপানিজ প্রতিষ্ঠান মেট্রোরেল উদ্বোধন করেছে। কারিগরি তদন্তের ফলে আমরা তা জানতে পারলাম, সরকারকে এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

মেট্রোর যত ঝুঁকি : কমিটির চিহ্নিত ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে-বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও স্থানচ্যুতি, পিয়ার, কংক্রিট বেস ও বক্স গার্ডারে ফাটল, সাময়িক গতিসীমা ও নিম্নমানের যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য, ডিপো ও ট্র্যাকের ভিত্তি বসে যাওয়া, ট্রেটজনিত কম্পন ও গতিশীল কার্যক্ষমতার ঘাটতি, নির্ধারিত স্থানের আগে ট্রেন থেমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও চাকার ক্ষয়, তৃতীয় পক্ষের অসম্পূর্ণ যাচাই, স্থায়ী কাঠামোগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা, এবং রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের সপ্তম সভার রেকর্ড অনুযায়ী, ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে এবং সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন প্রয়োজন।

বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা, মডেল সিমুলেশন, ডিজাইন ক্যালকুলেশন ও ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষীয় যাচাই বা প্রত্যয়নের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ট্রেনের কম্পন, অনুরণন, কাঠামোগত ক্লান্তি এবং চলমান ভারের প্রভাবের পূর্ণাঙ্গ গতিশীল বিশ্লেষণেও ঘাটতি পাওয়া গেছে।

বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায়ও একাধিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক কক্ষের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সমস্যা, স্পার্কিং এবং ১৬ স্টেশনের বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি প্রবেশের বিষয় রয়েছে। কমিটির মতে, এগুলো শর্টসার্কিট, আগুন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও সিগন্যালিং ব্যর্থতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নির্ধারিত স্থানের আগে ট্রেন থেমে যাওয়াকে কমিটি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর রোলিং-স্টক ত্রুটি হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এ সমস্যা ও চাকার ক্ষয়ের কারণে পাঁচটি ট্রেন সেট যাত্রী পরিবহণ থেকে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।

কারিগরি কমিটি জানিয়েছে, তাদের পক্ষে যন্ত্রনির্ভর পূর্ণাঙ্গ গতিশীল পরীক্ষা, পুরো রুটের ট্র্যাক-জ্যামিতি জরিপ, স্বাধীন ভূ-প্রকৌশলগত অনুসন্ধান ও পুরো ভায়াডাক্টের পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত মডেলিং করা সম্ভব হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক বা প্রত্যয়নকারী দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, এমআরটি লাইন-৬ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবহণ সম্পদ। তবে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে জরুরি সংশোধনমূলক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সমস্যাগুলোকে সাধারণ ত্রুটি নয়, বরং সামগ্রিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসংক্রান্ত সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করে কাঠামোগত মেরামত, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, পরিচালনগত ঝুঁকি দূর করা এবং স্বাধীন নিরাপত্তা যাচাইকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে কমিটি।

গতি কমিয়েও চলছে মেট্রোরেল : ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত মূল লাইনের ১০টি স্থানে সাময়িক গতিসীমা কার্যকর ছিল। নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও এসব অংশে তা ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটারে নামানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে ট্রেন ওই সীমারও ঘণ্টায় ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার কম গতিতে চলছে। কম্পন ও অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি এসব গতিসীমার অন্যতম কারণ। কমিটির মতে, সাময়িক গতিসীমা তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমাতে পারে, তবে সমস্যার মূল কারণের সমাধান নয়।

কেন এই নিরীক্ষা : ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে ৪৩৩ নম্বর পিয়ার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড পড়ে ৩৫ বছর বয়সি আবুল কালাম আজাদ নিহত এবং আরও দুজন আহত হন। এর প্রায় ১৩ মাস আগেও কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি বেয়ারিং প্যাড পড়ে স্থানচ্যুত হয়েছিল। পরবর্তী তিনটি রিটের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে পুরো এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ লাইনের ১৬টি উড়াল স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী চলাচল করেন।

ডিএমটিসিএল যা বলল : ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমকে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে ডিএমটিসিএলের জনসংযোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপ-সচিব) এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. আহসান উল্লাহ শরিফীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্যার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অল্প কিছুদিন হলো, তিনি প্রকল্প সম্পর্কে জানা-বোঝার চেষ্টা করছেন; এই মুহূর্তে তিনি কোনো কথা বলবেন না।

আহসান উল্লাহ আরও বলেন, মেট্রোরেলে ঝুঁকি, নির্মাণ ত্রুটি, কারিগরি কমিটির সুপারিশ এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রস্তুত রয়েছে। এরপর তিনি লিখিত একটি টেক্সট পাঠান। সেখানে বলা হয়েছে, কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে ১০টি স্টিল ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে। বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন এবং পিয়ার হেডে সেটেলমেন্ট মার্কার ও ক্র্যাক গেজ বসানোর কাজ চলছে। পুরো কাঠামোর বিভিন্ন স্থানে ১০২টি ক্র্যাক গেজ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পিয়ার ও বক্স গার্ডারের ফাটলের স্থায়ী সমাধানে বুয়েটকে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্পার্কিং ও স্টেশনে পানি প্রবেশের সমস্যা সমাধানেও কাজ চলছে।

২০২২ সালে একনেকে অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় ছিল ৩৩ হাজার ৪৭১ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা এবং কমলাপুর সম্প্রসারণসহ দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। অর্থাৎ, কিলোমিটার প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।

২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেলের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। আর উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে মেট্রো চলাচল শুরু হয় ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের চলাচল শুরু হয় ৫ নভেম্বর ২০২৩। এর আগের দিন দুই অংশের কাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।