Image description

দেশের সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সারা দেশে সংগঠনটির আওতাভুক্ত ইউনিয়নের সংখ্যা ২৫৩। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সড়ক পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনের সংখ্যা ৯৩২। এসব সংগঠন নানাভাবে পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদা আদায় করছে। মালিক-শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অনেক সদস্য, কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবহন খাতের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে একাধিক গবেষণা ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের কাজ অনেকটাই থমকে আছে। শুধুমাত্র মহাখালী বাস টার্মিনালকে ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে অস্থায়ী বাস ডিপোতে স্থানান্তর কাজ শুরু হয়েছে। গত ১৬ জুল্ইা পূর্বাচলের ২ নম্বর সেক্টরে গুতিয়াব এলাকায় এই বাস ডিপোর উদ্বোধন করা হয়। ৭ একর ১৩ শতক জমির ওপর এ বাস ডিপো নির্মাণের কাজ চলমান। বর্তমানে প্রায় দুইশ’ বাস প্রতিদিন এই ডিপোতে পাঠানোর কারণে মহাখালী বাস টার্মিনালে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। আগে যেখানে বাসের সারি হাতিরঝিল পর্যন্ত লম্বা হতো এখন সেই চিত্র নেই।

এদিকে বাকি তিনটি বাস টার্মিনালকে ঢাকার বাইরে কোথায় স্থানান্তর করা হবে সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে ডিপো স্থানান্তরের কোন জায়গায় নেয়া হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গাবতলীর টার্মিনালেরও একই অবস্থা। সাভারের কাছে হেমায়েতপুরে ডিপোটি স্থানান্তরের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলেও এখনও কাজ শুরু হয়নি। আর ফুলবাড়িয়া টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জ নেয়ার কাজ শুরু না হলেও এখানে যথেষ্ট পরিমাণ সরকারি জমি রয়েছে। যেগুলো দখল করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজ করছে বালু ব্যবসায়ীরা। তারা বিআউডাব্লিউটিএ’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সপ্তাহভিত্তিক মোটা অংকের টাকা দিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড় দখল করে চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

এ ছাড়াও রয়েছে ইট বেচাকেনার স্থান। সরকার ইচ্ছা করলেই সেগুলো উচ্ছেদ করে বাস ডিপো তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আবার বুড়িগঙ্গা সেতুঘেঁষেই রয়েছে বিআরটিএ’র অফিস। বিআরটিএ’র অফিস অন্যত্র সরিয়ে নিলে অনায়াসে সেখানে বাস ডিপো তৈরি করা সম্ভব। প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও কেন বাস টার্মিনালগুলোর ডিপো স্থানান্তরের কাজ থমকে আছে। তবে কী মালিকদের কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে না? নাকি তারাই চাচ্ছেন না ডিপোগুলো যাতে না সরানো হয়। এর নেপথ্যেও কী চাঁদাবাজির কোনো ব্যাপার আছে? শ্রমিকরা জানান, ডিপোতে বাস স্থানান্তর করতে গিয়ে জ্বালানি খরচ অনেকটাই বেড়েছে। তা ছাড়া শ্রমিকরা নতুন ডিপো স্থানান্তরের নেপথ্যে যে যুক্তিগুলো দেখাচ্ছে সেগুলো যৌক্তিক কোনো কারণ হতে পারে না।

খাওয়ার হোটেল নেই, মেকানিক পাওয়া যাচ্ছে নাÑএগুলো অজুহাত ছাড়া কিছুই নয়। কারণ ইতোমধ্যে রূপগঞ্জের ডিপোতে দোকান স্থাপনের জন্য মালিক সমিতির অফিসে তদবির শুরু হয়েছে। কে কোথায় দোকান নেবে তার জন্য তদবির করছেন চালক বা মেকানিকরাই। তবে মালিক সমিতির নেতাদের দাবি যেহেতু কাজ চলমান সেহেতু পরিকল্পনা ছাড়া খাবারের হোটেল স্থাপনের অনুমতি দেয়া যাচ্ছে না। মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, যেখানে-সেখানে দোকান বসতে দিলে ডিপোতে আবারও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বাসগুলো সময়মতো ডিপো থেকে বের হতে পারবে না। সব কাজ শেষ হলে অবশ্যই দোকানের অভাব হবে না।

অন্যদিকে, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির সাথে মালিক-শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অনেক সদস্য, কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে একাধিক গবেষণা ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশের পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো সারা দেশে কী পরিমাণ টাকা আদায় করে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, রাজধানী ঢাকায় এ খাতে প্রতিদিন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়, যার বড় অংশই তোলা হয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির নামে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠন এবং খন্দকার এনায়েত উল্লাহর নেতৃত্বাধীন মালিক সমিতি প্রকাশ্যে সারাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতো। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চাঁদার পরিমাণ কমলেও দৃশ্যমান নয়। অর্থাৎ কে কিভাবে চাঁদা আদায় করছে তা কেউ জানে না। তবে মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে চাঁদা দিতে হচ্ছে আগের মতোই। তবে তার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কম। একজন পরিবহন মালিক জানান, আসলে চাঁদা কিন্তু দিচ্ছে মালিকরাই। 

কারণ তারা শ্রমিক ইউনিয়নের কাছে অনেকটাই জিম্মি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটা বাস ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে মোট ৩০টি স্পটে চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি স্পটে চাঁদার পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এই চাঁদা কিন্তু মালিকদেরই দিতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপর। যাত্রাপথে চাঁদাগুলো তোলা হয় বলে কেউ তাদের চেনেও না। চাঁদা না দিলে তারা ঝামেলা করে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ চাঁদাও তোলা কিছুদিনের জন্য বন্ধ ছিল।

আদায়কৃত চাঁদার টাকা পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সংগঠন পরিচালনা ও নেতাদের সম্মানীর পেছনে ব্যয় হয় বলে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সূত্রে জানা গেছে। তবে আদায় করা চাঁদার তুলনায় এ ব্যয়কে নগণ্য হিসেবে উল্লেখ করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আদায়কৃত চাঁদার বেশির ভাগ ব্যয়েরই দৃশ্যমান কোনো খাত নেই। এ টাকা মূলত মালিক-শ্রমিক নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করেন এবং এ খাতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদেরও সে টাকার ভাগ দেন।

রাজধানীর মহাখালী টার্মিনালে একাধিক শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখানে প্রকাশ্যে কেউ চাঁদা তোলে না। সারাদিনে কয়টি গাড়ি ছেড়ে গেল তার একটা হিসাব থাকে কাউন্টারগুলোতে। সন্ধ্যার পর শ্রমিক সংগঠনের পক্ষে কেউ একজন এসে গাড়ি হিসাবে টাকা নিয়ে যায়। একই প্রক্রিয়া মালিক সমিতির বেলায়ও। তাদেরও প্রতিনিধি আছে। তারাও একই কায়দায় চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে। এ কারণে চাঁদা আদায় এখন আর দৃশ্যমান নয়।

দেশের পরিবহন খাতের মালিকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। আওয়ামী লীগ শাসনামলে এ সংগঠনের শীর্ষ নেতা ছিলেন এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। আওয়ামী লীগের পতনের পর এ সংগঠনের নেতৃত্বে এসেছেন বিএনপিপন্থি পরিবহন মালিক হিসেবে পরিচিত সাইফুল আলম। ঢাকার টার্মিনালগুলো স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। রূপগঞ্জের ডিপোটির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বাকি তিনটি নিয়েও কাজ চলছে। আমরাও চাই চারটি টার্মিনালই ঢাকার বাইরে নেয়া হোক। তাতে তো আমাদের কোনো লোকসান নেই। জ্বালানি খরচ একটু বাড়লেও সেটা আমাদের জন্য তেমন কিছু নয়।

এটা আমরাই বহন করবো। এতে করে ভাড়াও বাড়ানো হবে না। বরং পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, যেমনটা এসেছে মহাখালী টার্মিনালে। তবুও আমি বলবো না পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরেছে। আরো বাস নেয়া গেলে আমরা সঠিক ফলাফল পাব। 
চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগটি সত্য নয়। প্রতিটি কোম্পানি পরিচালনার কিছু খরচ রয়েছে। অফিস স্টাফ, ওয়ে বিল, টিকেটিং, কাউন্টার মাস্টার, সিরিয়ালম্যান, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়। এ খরচের টাকা পরিবহন থেকে তোলা হয়। কোম্পানি ও পরিবহন মালিকরা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে খরচের এ টাকা ব্যয় করেন। এটা কোনোভাবেই চাঁদাবাজি নয়।