Image description
ফাঁদে সিএমপি কমিশনারসহ ডজনখানেক পুলিশ কর্মকর্তা

ট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজ। বর্তমানে এপিবিএন প্রধান হিসেবে কাজ করা এই পুলিশ কর্মকর্তার নারীর প্রতি আছে বিশেষ দুর্বলতা। আর এই সুযোগ নিয়ে পুরো সিএমপি জুড়ে প্রভাব বিস্তার ও বদলি-পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের নাম জুবাইরুল হক জিয়ান। বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নে। পুলিশ কর্মকর্তা হাসিব আজিজের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ মানবজমিনের হাতে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথাও হয়েছে এই প্রতিবেদকের।

তারা জিয়ানের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী কয়েকজন ব্যক্তি পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করেছেন। জানা যায়, জুবাইরুল হক জিয়ান প্রথমে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে ‘সানজিদা’ নামে এক নারীর সখ্যতা গড়ে দেন। এরপর ‘সানজিদা’ নামে ফেসবুক আইডি ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলে কমিশনারের সঙ্গে আপত্তিকর-অশ্লীল চ্যাট শুরু করে। একপর্যায়ে সেই চ্যাট-স্ক্রিনশটের ভয় দেখিয়ে কমিশনারকে ব্ল্যাকমেইল করে সিএমপি’র বিভিন্ন থানায় বদলি, পদায়নসহ সব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জুবাইর নিজেকে কমিশনারের ‘শ্যালক’ পরিচয় দিয়ে ওসিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে এবং এর মাধ্যমে মোটা অঙ্গের অর্থ হাতিয়ে নেয়। শুধু পুলিশ কমিশনার নয়, চট্টগ্রামের ডজনখানে পুলিশ অফিসার, বিভিন্ন থানার ওসি, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের টার্গেট করে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ উঠেছে এই যুবকের বিরুদ্ধে। জুবাইরুল হক জিয়ান নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাতকানিয়া উপজেলা শাখার শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমীনের রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

আমীনের সঙ্গে রয়েছে তার একাধিক ছবি। অভিযোগকারীদের দাবি, গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জুবাইরুল হক জিয়ান ‘সানজিদা ইসলাম সায়মা’, ‘সুমি আহমেদ’, ‘তাজকিয়া আহমেদ সুমি’, জান্নাতুল নাইমা’ নামে একাধিক ফেসবুক আইডি পরিচালনা করে আসছে। এসব আইডিতে চট্টগ্রামের পরিচিত মডেল ও টিকটকারদের ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে পুরুষদের প্রেমের ফাঁদে ফেলা হতো। পরে আপত্তিকর স্ক্রিনশট ও চ্যাটের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ। এই ফাঁদে আটকে যান পুলিশ পরিদর্শক ইফতেখার, আব্দুর রহিম, করিম, শফিক, জসিম, আনসার, ফজলুল। তারা সিএমপি’র বিভিন্ন থানা ও বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা কেউ ২০ লাখ, কেউ ১০ লাখ টাকা দিয়ে প্রাথমিকভাবে জিয়ানের হাত থেকে রেহাই পেলেও সব তথ্য ফাঁস হয়ে যায় জিয়ানের হাত থেকে। জানা যায়, জুবাইরুল হক জিয়ান প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে ২০২০ সালের ৩০শে মে এবং ২০২৫ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি দুইবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়। জেল থেকে বের হওয়ার পরও তার প্রতারণার নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদকেও ফাঁদে ফেলেছিল জিয়ান।

অভিযোগে বলা হয়, জুবাইর নিজেকে কখনো সাতকানিয়া ছদাহার, কখনো বান্দরবানের আর্মি পাড়ার বাসিন্দা পরিচয় দিতো। তার প্রধান টার্গেট ছিলেন চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, জুবাইরুল হক ‘সানজিদা ইসলাম’ নামে একটি ফেসবুক আইডি ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলে চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভয়েস চেঞ্জ অ্যাপ ব্যবহার করে নারী কণ্ঠে কথা বলতো বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে নিজেকে কমিশনারের ‘শ্যালক’ পরিচয় দিয়ে সিএমপি’র ১৬ থানার ওসিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে মামলা বাণিজ্য ও পদায়নে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। একই কৌশলে ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি আইডি থেকে এক থানার তৎকালীন ওসির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, জুবাইরের সহযোগী হিসেবে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী কাজ করতো। যাদের অনেকের নামে জুলাই অভ্যুত্থানের মামলা রয়েছে।

তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগে বলা হয়। অভিযোগে বিএনপি’র এক এমপি প্রার্থী, কেরানীহাটের সাবেক ইজারাদার, সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও এক ঠিকাদারের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারা প্রাথমিকভাবে প্রতারণার শিকার হন। পরবর্তীতে এক ট্রাভেল এজেন্সির পরিচালককে চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলায় জড়ানোর অভিযোগও আনা হয়েছে। সাতকানিয়ার এক কাউন্সিলরের অভিযোগ ফাঁস করায় তার অফিসে একাধিকবার পুলিশি অভিযান চালানো হয় বলেও দাবি করা হয় অভিযোগপত্রে। অভিযোগে বলা হয়, জুবাইরুল হক নিজ এলাকার কয়েকজন নিরীহ ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীকে টার্গেট করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে। ৫ই আগস্টের পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি। অভিযোগকারীদের মতে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কিছু ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করেই জুবাইর এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলো। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা সামাজিক মাধ্যমে কিছু তথ্য প্রকাশ করলে তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী সিএমপি’র এক পরিদর্শক মানবজমিনকে বলেন, কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে সখ্যতা থাকার বিভিন্ন ডকুমেন্টস দেখে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। উনি কমিশনার স্যারের আত্মীয়। এ কারণে তাকে আমি বিভিন্ন উপহারও পাঠিয়েছিলাম। বই পাঠিয়েছিলাম। উনি আমাকে প্রেমের প্রস্তাবও দেয়। আমি তাকে বলি, আপনি কমিশনার স্যারের ঘনিষ্ঠ। আমি আপনাকে রেসপেক্ট করি।

এর বেশি সম্পর্কে জড়ানো তো সম্ভব নয়। পরে উনি আমাকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন। তবে অভিযুক্ত জুবাইরুল হক জিয়ান বলেন, আমার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং বা প্রতারণার সঙ্গে আমি জড়িত নই। এদিকে সিএমপি’র সাবেক পুলিশ কমিশনারকে ‘হানিট্র্যাপে’ ফেলার ঘটনায় জড়িত জোবাইরুল হক জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে তার গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ায় অভিযান চালিয়েছিল জেলা পুলিশের একটি দল। তবে সেসময় সরকারের প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রীর ফোন পেয়ে আভিযানিক দল খালি হাতে ফেরত আসে। বগুড়ার বাসিন্দা ওই প্রতিমন্ত্রীকেও জিয়ান ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি সূত্র।