Image description
ভাতা চিকিৎসা শিক্ষা সহায়তা ও কর্মসংস্থান

গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে আলাদা অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর অংশ হিসাবে মাসিক ভাতা, এককালীন ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। এজন্য আলাদা পুনর্বাসন তহবিল গঠন এবং জাতীয় বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরে গুম, খুন নির্যাতনের শিকার প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরি করবে নতুন অধিদপ্তর। গত দেড় দশকের বেশি সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আলাদা তথ্য দিয়েছে। ফলে সরকারি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ছে।

এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই ঘোষণাপত্রেও গত ১৬ বছরের গুম-খুন, হত্যা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং শহীদ পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার নোটিশে জানানো হয়-গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবার পুনর্বাসনে অধিদপ্তর গঠনের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’ বা কার্যবণ্টন সংশোধন সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে কাল রোববার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সভায় সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একজন করে উপযুক্ত প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান জানিয়েছেন, গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবারকে গেজেটভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য নতুন একটি অধিদপ্তর গঠন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং অর্থসচিবসহ ১৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া তালিকায় রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, যুব ও ক্রীড়া, পর্যটন, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, আইন ও বিচার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সচিবরা। এতে বোঝা যায়, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়-ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক স্বীকৃতির মতো একাধিক বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার চিন্তা করছে সরকার।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, গুমের ঘটনায় অভিযুক্তদের বড় একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। তাই গুমের তদন্ত পুরোপুরি পুলিশের হাতে থাকলে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তিনি স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নতুন অধিদপ্তর হলে এর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, ভুক্তভোগী বাছাইয়ের নিরপেক্ষ মানদণ্ড এবং তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া থাকতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা বা প্রশাসনিক প্রভাব যাতে সুবিধাভোগী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পুনর্বাসনের অর্থ যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য স্বাধীন নজরদারি ও সামাজিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

অধিদপ্তর গঠন করার পর এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে অর্থের সংস্থান। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এখনো ভুক্তভোগী পরিবারকে কত টাকা বা কী হারে সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে বিভিন্ন সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির ধরন অনুযায়ী প্রথমত, পরিবারের আয়ক্ষম ব্যক্তি গুম বা হত্যার শিকার হলে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভাতা দেওয়া হতে পারে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা ও নির্ভরশীল ব্যক্তির সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, গুম বা হত্যার ঘটনায় পরিবারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা নিখোঁজ হলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি রাখার সুযোগ রয়েছে। তৃতীয়ত, সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বিধবা বা অসহায় সদস্যদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য বাসস্থান সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া কর্মক্ষম সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান অথবা স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ পুনর্বাসনকে শুধু নগদ অর্থ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সমন্বিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।