তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এমন এক বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে সিরিয়া পরিণত হয়েছে দুই আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থানের প্রধান মঞ্চে। ১৮ আগস্ট উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা সেই উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, ঘাঁটিটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছিল; তুরস্ক ও সিরিয়া এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এখানে মূল প্রশ্ন বিমানঘাঁটিতে হামলা হয়েছে কি না—তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় কার প্রভাব কতটা থাকবে? ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার ক্ষমতার কাঠামো বদলে গেছে। তুরস্ক নতুন সিরীয় নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান সমর্থক। সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে আঙ্কারা সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অন্যদিকে ইসরায়েল নতুন সিরীয় ব্যবস্থাকে এখনো সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই জায়গাতেই তুরস্ক–ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরাসরি সংঘর্ষের দিকে এগোতে পারে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা দর্শন দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে—তার সীমান্তের কাছে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী হতে দেওয়া যাবে না। ইরানের ক্ষেত্রে যে নীতি ইসরায়েল প্রয়োগ করেছে, এখন তুরস্কের ক্ষেত্রেও তার কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ তুরস্ককে সিরিয়ায় ‘বিপজ্জনক দুঃসাহসিকতা’ থেকে বিরত থাকার সতর্কতা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, সিরিয়ার দক্ষিণ দিকে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বিস্তার ইসরায়েল মেনে নেবে না।
অন্যদিকে তুরস্কের কাছে সিরিয়া শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি আঙ্কারার আঞ্চলিক শক্তি-প্রক্ষেপণের কেন্দ্র। সিরিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করলে তুরস্ক একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ফলে ইসরায়েল যদি তুরস্কের সেই উপস্থিতি সীমিত করতে চায়, আঙ্কারার কাছে সেটি কেবল সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন থাকবে না—তা হয়ে উঠবে তুরস্কের আঞ্চলিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য আছে। দুই দেশই যুদ্ধ চায়—এমন ধারণা ভুল। তুরস্ক NATO সদস্য এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। সরাসরি তুরস্ক–ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে ওয়াশিংটনের জন্য তা অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি ‘deconfliction mechanism’ বা সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।
কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। যুদ্ধ অনেক সময় পরিকল্পনা করে শুরু হয় না; ভুল হিসাব থেকেই যুদ্ধের সূচনা হয়। সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি বিমান অভিযান, তুরস্কের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সম্ভাব্য মোতায়েন, সিরীয় বাহিনীর পুনর্গঠন—সব মিলিয়ে একই ভূখণ্ডে বহু সামরিক শক্তি সক্রিয়। একটি ভুল গোয়েন্দা তথ্য, একটি বিমান ভূপাতিত হওয়া, কোনো সামরিক ঘাঁটিতে ভুল হামলা কিংবা তুর্কি সেনা হতাহত হওয়া পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাজা প্রশ্ন। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের গাজা নীতির কঠোর সমালোচক। ২১ আগস্ট আঙ্কারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের Red Notice চাওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। ফলে সিরিয়ার সামরিক উত্তেজনার সঙ্গে গাজা-রাজনীতি ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংঘাতও যুক্ত হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিরিয়া এখন শুধু সিরিয়ার যুদ্ধ নয়। এখানে ইরানের পুরোনো প্রভাব, তুরস্কের নতুন প্রভাব, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। আবু আল-দুহুর হামলা তাই একটি বিমানঘাঁটিতে হামলার চেয়ে অনেক বড় বার্তা—ইসরায়েল তুরস্ককে জানিয়ে দিয়েছে যে সিরিয়ার সামরিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আঙ্কারা এককভাবে এগোতে পারবে না।
আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে তিনটি: সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি কতটা বাড়ে, ইসরায়েল কতটা সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর সংঘর্ষ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কত দ্রুত দাঁড় করাতে পারে।
সুতরাং, তুরস্ক–ইসরায়েল যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি; কিন্তু যুদ্ধের সম্ভাব্য অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে সিরিয়ার মাটিতে। মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী বড় সংঘাত হয়তো গাজা, লেবানন কিংবা ইরানকে কেন্দ্র করে নয়—সিরিয়ার আকাশেই তার প্রথম সংকেত দেখা যেতে পারে।সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্ক–ইসরায়েল: মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন যুদ্ধের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে?