Image description

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সামলে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ছয় মাসের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধের কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও জ্বালানি তেল ও এলএনজি নিয়ে ভুগতে হয়। তবে বিগত মাসগুলোতে এ পরিস্থিতি সামলে নিয়েই বেশ কিছু অগ্রগতি দেখিয়েছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়টি। এ সময়ের মধ্যে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কূপ ও ওয়ার্কওভারের কাজ শুরু করা হয়েছে। এজন্য বর্তমানে নতুন রিগ (গ্যাস অনুসন্ধান যন্ত্র) ক্রয়ের প্রক্রিয়াও চলছে। জ্বালানি তেলের মজুত বৃদ্ধির জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজার থেকে দেশে তেল পরিবহনে কিছুটা সমস্যা হয়। সে সময় দেশের জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হলেও সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। গ্যাসসংকটে সরকারের শুরুর দিকে লোডশেডিংয়ে খুব একটা সমস্যা না হলেও গত জুলাই থেকে গ্যাস ও কয়লাসংকটের কারণে লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের ভুগতে হচ্ছে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সংকট মোকাবিলায় আমরা ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেখতে হবে- আমরা এ ব্যাপারে প্রো অ্যাকটিভ কি না। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আমাদের যে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে সেটি ছিল চ্যালেঞ্জিং।’ তিনি আরও জানান, কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, গ্যাসের সিস্টেম লস ৬ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মডেল পিএসসি ২০২৬ চূড়ান্ত করা এবং কয়লা উত্তোলনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের পুরোটাই চ্যালেঞ্জের। আর্থিক সংকট, অনিয়ম, দুর্নীতি সব মিলিয়ে এ খাতে রয়েছে বিরাট চ্যালেঞ্জ।’

গ্যাস অনুসন্ধানে গতি বেড়েছে : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের কর্মপরিকল্পনায় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও জ্বালানি বিভাগের তত্ত্বাবধানে দৈনিক আনুমানিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার কথা। এর অংশ হিসেবে পরিত্যক্ত কূপগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ৭টি অনুসন্ধান কূপ, ৭টি উন্নয়ন কূপ এবং ২টি কূপের ওয়ার্কওভারের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বানের পর স্থলভাগে ইজারা দিতে একটি মডেল উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করার পথে সরকার। সরকার দায়িত্বে আসার ১৮০ দিনের মধ্যে এ দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্য সামনে রেখে খসড়া মডেল পিএসসি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ফিরে এলেই তা মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

এরই মধ্যে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে পেট্রোবাংলা। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এ দরপত্র জমার সুযোগ আছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এখন পর্যন্ত সাতটি দেশিবিদেশি কোম্পানি পেট্রোবাংলার থেকে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। এ ছাড়া তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। 

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবার পিএসসি সংশোধন করে আগের তুলনায় আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।  সূত্র জানায়, গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের জন্য ২০০০ হর্স পাওয়ারের রিগ ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ হর্স পাওয়ারের একটি রিগ কেনার জন্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি রিগ সংগ্রহের জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য তা পরিকল্পনা কমিশনে  পাঠানো হবে।

এরই মধ্যে স্থলভাগে ২৯টি কূপ খনন বা ওয়ার্কওভার সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও অনেকগুলো কূপের কার্যক্রম চলমান আছে। এ ছাড়া নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সিসমিক জরিপও পরিচালিত হচ্ছে। দুটি ব্লকে দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলোর তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) একটি মূল্যায়নসহ-উন্নয়ন কূপ এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরতার বেগমগঞ্জ-৫, ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতার বেগমগঞ্জ-৬ এবং ৫ হাজার ৩০০ মিটার গভীর সুনেত্রা কূপগুলো খনন করা হবে।

এলএনজি আমদানিতে কাজ করছে সরকার : সূত্র জানায়, এলএনজি আমদানির বিষয়ে বর্তমানে জ্বালানি মন্ত্রণালয় মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ওমান, আজারবাইজান, আলজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। আর এলএনজি অবকাঠামো স্থাপনে খুব বেশি অগ্রগতি না হলেও মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানোর কাজ পেতে যাচ্ছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই)। চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘জিটুজি’র আওতায় সিএনইইকে এ টার্মিনাল বসানোর কাজ দিতে যাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ।

কয়লায় অগ্রগতি নেই : জানা গেছে, কয়লা উন্নয়নের জন্য ৫টি আবিষ্কৃত কয়লা ক্ষেত্র থেকে কয়লা উন্নয়ন বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা ছিল। বড়পুকুরিয়া কয়লা ক্ষেত্রের উত্তর-দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খননের জন্য কারিগরি-আর্থিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি তেমন নেই। পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘কয়লা উত্তোলন বিষয়ে আমাদের যে চলমান কাজ তা চালু রেখেছি। বড়পুকুরিয়াতে নতুন করে আরও ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলনের কাজ চলমান আছে।

এরই মধ্যে সেখানে বোরহোল করা হয়েছে। এখন নকশার করার কাজ এগিয়ে চলছে। তবে এখানে কোন কোম্পানি কয়লা উত্তোলন করবে- সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। আর খালিশপুরে ২০০৬ সালে একটি বেসরকারি কোম্পানি কয়লা অনুসন্ধান কার্যক্রমের জন্য লাইসেন্স পেয়েছিল, সেই কোম্পানিটিই এখানে কয়লা অনুসন্ধানের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করছে। তেল মজুতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ : সূত্র জানায়, সরকার জ্বালানি তেলের মজুত ৬০ দিন থেকে বৃদ্ধি করে ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জ্বালানি বিভাগ জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করছে।

সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে আগামী চার বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য খাত থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় নতুন করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্যোক্তাদের কাছে সরকার উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করছে। সরকারি অফিস ভবনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারে গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পিকআওয়ারে মার্কেট ও শপিং মলে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহারের জন্য নিয়মিত ভিজিলেন্স টিম কাজ করছে।