Image description

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে স্ক্র্যাপ জাহাজ এমটি রাসি কাটার সময় ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানিতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড দ্রবীভূত (মিশে থাকা) অবস্থায় ছিল। ট্যাংকটির কিছু অংশ কাটার পর সেই স্থান দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি থেকে বিষাক্ত গ্যাসীয় পদার্থটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শ্রমিকের নিঃশ্বাসে মিশলে তারা প্রাণ হারান। বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেছে। এদিকে দুর্ঘটনার জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরকে দায়ী করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছে শ্রমিক ও স্থানীয়দের একটি সংগঠন।

দুর্ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের উৎস, ধরন ও অন্যান্য বিষয় তদন্তে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খানের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলটি গত বুধবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে দুর্ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার ফলাফল হাতে আসার আগ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করতে পারছেন না তারা। এ কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করেননি দলটির প্রধান। একই সঙ্গে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতেও তিনি রাজি হননি। জানতে চাইলে অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান গতকাল বিকালে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইডকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত মাটি, পানি, বাতাস ও অন্যান্য নমুনা পরীক্ষার ফল আসতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। ওইসব পরীক্ষার ফলাফল হাতে আসলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রকাশ করা হবে।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশেষজ্ঞ দলের এক সদস্য নিশ্চিত করেছেন, ‘দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে অনুমান করা যাচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংকটিতে হাইড্রোজেন সালফাইড দ্রবীভূত অবস্থায় ছিল। ট্যাংকটি কাটার পর ভিতর থেকে বাইরে পানি গড়িয়ে পড়ায় বিষাক্ত গ্যাসটি আবার বাতাসে মিশে শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসে। এ কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেলে এটা আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।’

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে কয়েক দফায় দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ দল ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তাদের সঙ্গে সামুদ্রিক প্রকৌশল ও নৌপরিবহনে অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থা প্রান্তিক মেরিন সার্ভিসেস ও আলিফ মেরিন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের কর্মীরাও সেখানে যান। এ সময় তারা সেখানকার পরিবেশে কোনো ক্ষতিকর গ্যাসের অস্তিত্ব পাননি। তবে ব্যালাস্ট ট্যাংকটি পানিতে পূর্ণ হওয়ায় সেটার ভিতরের পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি। পরবর্তীতে তারা সেখানকার পানি ও স্লাজ পরীক্ষার জন্য বুয়েট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে পাঠান। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বলেন, ‘যেসব নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে সেগুলোর ফলাফলের জন্য সবাই অপেক্ষা করছেন। ফলাফল অনুযায়ী ব্যালাস্ট ট্যাংকটির ভিতরে পরীক্ষা এবং আরও দুটি ট্যাংকের কী পরিস্থিতি সেটা জানতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ফলাফল হাতে পাওয়া ছাড়া আপাতত ট্যাংকের ভিতরে ঢোকা কিংবা পরিবেশ যাচাইয়ের নিরাপত্তা কৌশল ঠিক করা যাচ্ছে না।’

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি : এদিকে গত ১৪ আগস্ট বিষাক্ত গ্যাস লিকেজে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরকে দায়ী করে আগামী সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা ১১টায় প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছে জাহাজভাঙা শ্রমিক সেফটি কমিটি নামের একটি সংগঠন। জাহাজভাঙা শ্রমিক, সীতাকুণ্ডের স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে এই কমিটির মাধ্যমে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিয়ে কাজ করে আসছে সংগঠনটি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজও এই কর্মসূচিতে যুক্ত থাকবে। এর আগেও দুর্ঘটনার পেছনে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের গাফিলতিকে দায়ী করেছিল শ্রমিক সংগঠনগুলো।

সংগঠটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রতিটি জাহাজ কাটার আগে গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। তারা গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার পরও সেখানে কীভাবে গ্যাস থাকে এটাই প্রশ্ন। মূল দোষ তো তাদের। এর আগেও গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ হয়ে অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবারই তারা (বিস্ফোরক অধিদপ্তর) পার পেয়ে যায়। তাদের নিয়ে কোনো আলোচনাই হয় না। এবার আমরা জবাব জানতে চাই। এ কারণে তাদের কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছি।’

এ ব্যাপারে জানতে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেনকে ফোন করলেও তিনি রিসিভি করেননি।