Image description

সারা দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে বাসাবাড়ির রান্নার কাজে। দিনের অধিকাংশ সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় বদলে গেছে নগরবাসীর রান্নাঘরের স্বাভাবিক চিত্র। কোথাও ভোরে, আবার কোথাও গভীর রাতে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া গেলেও তা দিয়ে নিয়মিত রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সংকটের বিকল্প হিসেবে অনেকেই বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকার ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে এতে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপছে পরিবারগুলোর ওপর। অন্যদিকে, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বাড়তি দামের কারণে সেটিও অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে একদিকে নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত খরচ-দুইয়ের চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো পড়েছে বিপাকে।

নগরবাসীর অভিযোগ, মাসের শুরুতেই বাড়িভাড়ার সঙ্গে গ্যাসের বিল পরিশোধ করেও রান্নার জন্য তাদের অতিরিক্ত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন, কেউ রাইস কুকার ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তরাঁ থেকে খাবার কিনে আনছেন। গ্যাস সংকটের কারণে কেনা বৈদ্যুতিক চুলায় পরিবারভেদে মাসে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল যোগ হচ্ছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, মুগদা, মানিকগর, ভাষানটেকসহ পুরান ঢাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। সকাল হলেই গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে ফলে অনেককে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় রান্নার জন্য। রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত মিলে গ্যাস। ফলে কর্মজীবী মানুষরা পড়েছেন চরম বিপাকে। কর্মজীবী মানুষ ও স্কুলগামী শিশুদের জন্য সকালের নাস্তা তৈরিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা শাকিল হোসেন। শাকিল হোসেন মাসের শুরুতে বাড়িভাড়ার সঙ্গে গ্যাস বিল দিয়ে এখন অতিরিক্ত আরও ৫-৬ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে রান্নার জন্য। শাকিল বলেন, গত কয়েকদিন ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট। রান্না করতে গিয়ে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বাড়তি। ফলে বাধ্য হয়ে গত সপ্তাহে ইনফ্রারেড বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। ফলে একদিক দিয়ে গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে অন্যদিক দিয়ে বিদ্যুৎ বিলও বাড়তি দিতে হচ্ছে।
একই হাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন রজনী বোস লেনের বাসিন্দা নাসরিন আক্তারের। নিভু নিভু আগুনে রান্না করতে করতেই ৩-৪ ঘণ্টা সময় চলে যায়। সবচেয়ে বেশি বেগ পোহাতে হয় অফিসগামী স্বামী ও সন্তানদের জন্য নাস্তা তৈরিতে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গ্যাস না পেলেও প্রতি মাসে ঠিকমতোই গ্যাস বিল দিতে হয়। কয়েকদিন হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়েছিল কিন্তু বাইরের খাবার খেয়ে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা আর রাইস কুকার দিয়ে রান্না করতে হয়।

মিরপুর ১ নম্বরের জোনাকী রোডের বাসিন্দা মিরন হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস থাকে গভীর রাতে, তখন সবাই ঘুমায়। ঘুম বাদ দিয়ে তো রান্না করা যায় না। এখন বৈদ্যুতিক চুলাই একমাত্র ভরসা। তাও লোডশেডিংয়ের কারণে মাঝে মাঝে চুলা বন্ধ হয়ে যায়। এক দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছি।
পেটের ক্ষুধা মেটাতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ: এদিকে গ্যাস সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা কেনার সামর্থ্য নেই। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা। পরিবারের সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করতে তাদের অনেককেই গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাত গভীর হওয়ার পর গ্যাস এলে শুরু হয় রান্নার ব্যস্ততা, যা অনেক সময় ভোর পর্যন্ত গড়ায়।

অটোরিকশা চালিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সায়েদাবাদ এলাকায় টিনশেড ঘরে ভাড়ায় থাকেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, গভীর রাতে গ্যাস আসে, অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দিতে হয়। অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চুলা বা গ্যাস সিলিন্ডার কেনার টাকা নেই। তাই আমার স্ত্রী না ঘুমিয়েই গভীর রাতে রান্না করে।
বিক্রি বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের: তীব্র গ্যস সংকটে বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের পাশাপাশি চাহিদা বেড়েছে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড- এ দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা। বিকল্প হিসেবে বিক্রি বেড়েছে রাইস কুকারেরও। মান ভেদে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিঙ্গেল ইনফ্রারেড চুলা ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডাবল ইনফ্রারেড চুলা ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, সিঙ্গেল ইন্ডাকশন চুলা সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে, পরিচিত ও নামি ব্র্যান্ডের চুলার দাম অপরিচিত ব্র্যান্ডের চেয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি।

গুলিস্তান ন্যাশনাল স্টেডিয়াম মার্কেটের ব্যবসায়ী সামাদ মৃধা বলেন, গ্যাস সংকট দেখা দিলে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের বিক্রি বেড়ে যায়। গত দেড় মাসে বেচাকেনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দাম কম থাকায় সিঙ্গেল ইনফ্রারেড চুলার বিক্রি একটু বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া রাইস কুকারও বিক্রি হচ্ছে। যদিও এটি দিয়ে সব রান্না করা সম্ভব না তবুও বিকল্প হিসেবে রাইস কুকার কেনার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

যাত্রাবাড়ী এলাকার ভাই ভাই হার্ডওয়্যারের দোকানি তারেক হোসেন বলেন, সাধারণত শীতের সময় গ্যাসের চাপ কমে যায় তখন বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হয় বেশি। কিন্তু এবার গ্রীষ্মেই গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, তাই বিক্রি বেড়ে গিয়েছে। বৈদ্যুতিক চুলায় মাসে ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিল আসে। যা গ্যাস সিলিন্ডার তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী তাই সাধারণ ক্রেতারা এদিকেই বেশি ঝুঁকছে। আর রাইস কুকার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে।