ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার জেরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
একইসঙ্গে ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে (প্রশাসন ও অর্থ) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ওবায়দুর রহমান বিষয়টি জানিয়েছেন।
এর আগে বুধবার বিকাল পৌনে ৫টার দিকে জেলা পুলিশ বিবৃতি দিয়ে এ বিষয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটা জানিয়েছে। সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো পুলিশের মিডিয়া উইংয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশ লাইনসে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ লাইনস গেটে এবং কম্পাউন্ড ডিউটিতে বিচ্যুতির অভিযোগে তিন জন পুলিশ সদস্যকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার পূর্বক পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, এর প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তাধীন বিষয়ে অনুমাননির্ভর বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হলো। তবে বিবৃতিতে প্রত্যাহার হওয়া তিন পুলিশ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তারা পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়।
এ ঘটনার পর রাত আড়াইটা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশ সদস্যদের বিচার, কনসার্ট বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানান। পরে উভয় পক্ষকে নিয়ে সভা করে পরিস্থিতি শান্ত করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভোর পর্যন্ত আলোচনা চলে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আমরা দোষীদের চিহ্নিত করবো। ফুটেজে সবটাই দেখা যাবে। সভায় উন্মুক্ত কোনও কনসার্ট করা যাবে না বলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি আসে। উত্তরে পুলিশ বলেছে, আমার কর্ম আমি করবো, অন্য কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এরপর উভয় পক্ষ শান্ত হয়েছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা উপলক্ষে মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। এ উপলক্ষে রাতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা পুলিশ। অনুষ্ঠানে ডিআইজি ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ওবায়দুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলামসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার অনুষ্ঠান থেকে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পুলিশ লাইনসের পশ্চিম পাশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার অবস্থান। অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চ স্বরে গানবাজনার অভিযোগ তুলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এতে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়।
পরে মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটা শুরু করলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জবাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে পুলিশের সাত সদস্যসহ উভয় পক্ষের ৩০ জন আহত হন। আহত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনার পর পুলিশ লাইনসের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিল্পীরা আটকা পড়েন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দল শহরের পুরাতন জেলা রোড, কুমারশীল মোড় ও হাসপাতাল সড়কে রাত ২টার দিকে বিক্ষোভ করেন। রাত আড়াইটার দিকে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে বিভিন্ন দাবি জানান।
ঘটনার পরপরই রাতেই দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যান জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম। তিনি পুলিশ ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে সভা করেন। সভায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ মাদ্রাসার শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেন, ‘ছাত্রদের দাবি ছিল, এখানে কনসার্ট করা যাবে না, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ বরখাস্ত এবং আহত ছাত্রদের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া। পুলিশ আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, দায়িত্বে থাকা পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হবে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ‘আমি রাতে চলে এসেছি। ঘটনা শুনেছি। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এসপিসহ অন্যরা বিষয়টি নিয়ে রাতভর ব্যস্ত ছিলেন। তারা কথা বলবেন।’
জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইজি ও এসপি স্যার পুলিশ লাইনস থেকে চলে যান। রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান ফটকের পকেট গেট দিয়ে ৩০-৪০ জন মাদ্রাসাছাত্র ঢুকে পড়েন। তারা ভেতরের ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড দিয়ে চেয়ার ভাঙচুর করেন। সদর থানার ওসিসহ আমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এরপর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’